বিশ্ববাজারের অস্থিরতা ও আমদানিতে ক্রমবর্ধমান ভর্তুকির চাপ সামলাতে দেশে ভোক্তা পর্যায়ে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শনিবার দিবাগত মধ্যরাত থেকেই প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪০ টাকা, পেট্রল ১৩৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩০ টাকায় বিক্রির সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে ১৮ এপ্রিল রাতে জারি করা এক গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে এই মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হয়। নতুন সমন্বয়ে প্রতি লিটার ডিজেল ১৫ টাকা, কেরোসিন ১৮ টাকা, পেট্রল ১৯ টাকা এবং অকটেন সর্বোচ্চ ২০ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা ও অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখতেই এই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।
তবে সরকারের এই যুক্তির বিপরীতে অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাবের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ বা শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে। ডিজেলনির্ভর পরিবহন খাতের ব্যয় বাড়ায় যাত্রী ভাড়া ও পণ্য পরিবহন খরচ মুহূর্তেই আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাবে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম হবে নিয়ন্ত্রণহীন। কৃষি খাতে সেচ, ট্রাক্টর ও মাড়াই যন্ত্রের খরচ বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় কয়েক গুণ বাড়বে। প্রান্তিক কৃষক পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পেলে দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।
একই সঙ্গে শিল্প-কারখানায় জেনারেটর নির্ভর উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি সক্ষমতা যেমন কমবে, তেমনি স্থানীয় বাজারেও প্রতিটি ব্যবহার্য পণ্যের দাম বাড়বে। এই বহুমুখী চাপ সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে অর্থনীতিকে এক দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর মন্দার দিকে ঠেলে দিতে পারে। ইতিমধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। এখন জ্বালানির বাড়তি দামের ফলে নতুন করে মুদ্রাস্ফীতি ঘটলে তা নিম্ন ও মধ্যবিত্তের আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেবে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই উল্লম্ফন দেশের মূল্যস্ফীতিকে দুই অঙ্কের (ডাবল ডিজিট) ঘরে নিয়ে যেতে পারে, যা নিয়ন্ত্রণে আনা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
এর আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, অপ্রচলিত উৎস ও স্পট মার্কেট (খোলা বাজার) থেকে আমদানিতে খরচ বৃদ্ধির কারণে মূল্য সমন্বয় প্রয়োজন হতে পারে। হরমুজ প্রণালী সাময়িকভাবে পুনরায় খুলে দেওয়ার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম যখন কিছুটা কমতির দিকে ছিল, ঠিক তখনই দেশে এই মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা এল। যার ফলে শনিবার রাত থেকেই রাজধানীর প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে দেখা গেছে যানবাহনের কিলোমিটারব্যাপী দীর্ঘ লাইন। তেলের জন্য অপেক্ষমাণ গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অস্থিরতা বিরাজ করছে।
এদিকে সরকারের এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। এক ফেসবুক পোস্টে তিনি এই মূল্যবৃদ্ধিকে ‘গভীরভাবে দুর্ভাগ্যজনক’ অভিহিত করে বলেন, যখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমছে, তখন দেশে দাম বাড়ানো হয়েছে যা জনগণের ওপর অসহনীয় বোঝা। তিনি উল্লেখ করেন, দেশে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে রাখা হয়েছে এবং এই মূল্যবৃদ্ধি কৃষি ও শিল্প উৎপাদনকে পঙ্গু করে দেবে। জামায়াত আমিরের মতে, এটি সাধারণ মানুষের পকেট কাটার এক নতুন কৌশল।
উল্লেখ্য যে, পাঁচ সপ্তাহ ধরে চলমান ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়লেও গত ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত নতুন বিএনপি সরকার দাম বৃদ্ধি করেনি। বৈশ্বিক এই সংকটকালে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে সরকার বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি দিয়ে আসছিল। গ্লোবাল ভয়েসেসের তথ্যমতে, শুধু গত মার্চ মাসেই জ্বালানি খাতে সরকারকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। তবে বর্তমানে আমদানি ব্যয় যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে ভর্তুকির ভার বহন করা সরকারি কোষাগারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জিরো কার্বন অ্যানালিটিক্সের প্রাক্কলন অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতি বজায় থাকলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যয় গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪.৮ বিলিয়ন ডলার (৪০ শতাংশ) বৃদ্ধি পেতে পারে। বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য আমদানি করতে হয়। এই বিপুল পরিমাণ ডলারের সংস্থান করা এখন অর্থনীতির জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ।
এই তারল্য সংকট কাটাতে সরকার ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) সহ বিভিন্ন সংস্থার সাথে আলোচনা শুরু করেছে। রয়টার্স ও এএফপির তথ্যমতে, সরকার আইএমএফের কাছ থেকে ১.৩ বিলিয়ন ডলার এবং এডিবি থেকে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ পাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। এ ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে ২ বিলিয়ন ডলারের জরুরি তহবিলের অনুরোধ জানিয়েছেন। এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) এবং বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে দ্রুত সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।













