নীতিগত সংস্কারে স্বস্তি হলেও বড় লক্ষ্যমাত্রায় শঙ্কা

Web Photo Card June 11 2026 AdvanceTaxBD
ডিএসজে

কর ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের পদক্ষেপে ব্যবসায়ী মহলে স্বস্তি এলেও প্রস্তাবিত বাজেটের উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানির অনিশ্চয়তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ও অর্থবিলের ওপর পৃথক প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা চেম্বার (ডিসিসিআই), ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার (ফিকি), টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) এবং আবাসন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন রিহ্যাব সরকারের নীতিগত সংস্কারকে সাধুবাদ জানালেও মাঠপর্যায়ে এর সফল বাস্তবায়ন নিয়ে তীব্র সংশয় প্রকাশ করেছে। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ ধরে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বাভাসযোগ্য কর কাঠামোর দাবি জানিয়েছেন সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতারা।

প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেটের সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রাকে বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং বলে অভিহিত করেছে ঢাকা চেম্বার (ডিসিসিআই)। সংগঠনটির সভাপতি তাসকীন আহমেদ জানান, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩০.৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি বর্তমান মন্দা পরিস্থিতিতে অবাস্তব এবং এই ঘাটতি পূরণে সরকারের ব্যাংকঋণ নির্ভরতা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করবে। তবে তিন লাখ কোটি টাকার এডিপি বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার বাড়লেও চলতি বছরের মাত্র ৩৬.১৯ শতাংশ দুর্বল বাস্তবায়ন হারের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি সফল বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়ার তাগিদ দেন।

ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দাবি মেনে উৎস কর কর্তনকে (টিডিএস) ন্যূনতম করের পরিবর্তে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করার সরকারের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তকে যৌথভাবে স্বাগত জানিয়েছে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ডিসিসিআই ও ফিকি।

ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বারের (ফিকি) পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই একটি যুগান্তকারী সংস্কারের ফলে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর চলতি মূলধনের দীর্ঘদিনের তীব্র সংকট এক লাফে অনেকটাই লাঘব হবে। এছাড়া শিল্প কাঁচামালে উৎসে কর ৪ শতাংশে হ্রাস, ৬০টি নিত্যপণ্যে ০.৫ শতাংশ উৎসে কর এবং উৎসে কর কর্তন না করার কারণে ব্যবসায়িক খরচ অনুমোদন না করার কালো আইনটি বাতিল করায় করদাতারা বড় ধরনের স্বস্তি পাবেন।
বাজেট-পরবর্তী প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় আবাসন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন রিহ্যাবের প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে আবাসন খাতের গতি ফেরাতে কোনো কার্যকর প্রণোদনা তো দেওয়া হয়ইনি, উল্টো রড ও সিমেন্টের ওপর সুনির্দিষ্ট ভ্যাট আরোপ আবাসন খাতকে আরও সংকুচিত করবে।

তিনি বলেন, আবাসন খাতের সঙ্গে দেশের প্রায় ২৬৯টি লিংকেজ শিল্প প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত রয়েছে। ফলে নির্মাণসামগ্রীর বাড়তি দামের কারণে আবাসন খাতের গতি কমে গেলে রড, সিমেন্ট, সিরামিক, আসবাবপত্র ও পরিবহনসহ অসংখ্য শিল্প এবং লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার নেতিবাচক প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর পড়বে।

রিহ্যাব প্রেসিডেন্ট ড. আলী আফজাল সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ফ্ল্যাট ও জমি নিবন্ধন ব্যয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার দাবি জানানো হলেও এবারের বাজেটে তার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। তিনি মনে করেন, নিবন্ধন ব্যয় কমানো হলে প্রকৃত লেনদেন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেত, যা সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতেও বড় ভূমিকা রাখত। তবে বাজেটে ঘোষিত “স্বপ্রণোদিত বিনিয়োগ প্রদর্শন” এর মাধ্যমে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই ফ্ল্যাট ও প্লটের প্রকৃত মূল্য দেখানোর বিশেষ সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিকে রিহ্যাব ইতিবাচক ও স্বাগতযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে এবং বাজেট-পরবর্তী আলোচনায় আবাসন খাতের দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছে।

তবে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারাবাহিকতা না থাকা এবং ব্যক্তিগত আয়করের সর্বোচ্চ হার এক লাফে বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করার তীব্র সমালোচনা করেছে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শীর্ষ সংগঠন ফিকি। সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, উচ্চ করের কারণে দক্ষ বিদেশি পেশাদারদের নিয়োগের খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আসার গতি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। কোনো ধরনের অন্তর্বর্তীকালীন সময় বা মাঠপর্যায়ের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই বৃহৎ ও বহুজাতিক করদাতাদের জন্য ই-ভ্যাট সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক করা মারাত্মক ব্যবহারিক ও প্রযুক্তিগত জটিলতা তৈরি করবে বলে উদ্বেগ জানিয়েছে ফিকি।

দেশের প্রধান ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ও রপ্তানি আয়ের অন্যতম উৎস প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতের সংগঠন বিটিএমএ বাজেটের শুল্ক পুনর্বিন্যাসকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও কিছু আইনি ফাঁকফোকর নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছে। বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, রপ্তানির নগদ সহায়তার ওপর এআইটি ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা এবং তুলা সরবরাহে উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে ০.৫০ শতাংশ করা অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক।

তবে ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার করায় দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হবে।
টেক্সটাইল খাতের বিদ্যমান সংকট মোকাবিলায় কর্পোরেট করের হার ১৫ শতাংশ নির্ধারণ করার জোর দাবি জানিয়ে বিটিএমএ সভাপতি তার প্রতিক্রিয়ায় জানান যে, উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের তীব্র অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের কারণে এই খাতটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এমনিতেই ব্যাকফুটে রয়েছে।

ঢাকা চেম্বারের সুরে সুর মিলিয়ে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো একবাক্যে জানিয়েছে, ৬.৯৫ লাখ কোটি টাকার বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে করের হার না বাড়িয়ে করের পরিধি বাড়াতে হবে। একই সাথে আমদানি-নির্ভর জ্বালানিতে সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি মূল্য কাঠামো তৈরি না করলে স্বল্পমেয়াদি সরকারি ভর্তুকি বিনিয়োগের পরিবর্তে কেবল রাষ্ট্রীয় অপচয়ই বাড়াবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top