বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে এক উদ্বেগজনক প্রবণতা সামনে এসেছে। সামগ্রিক আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও দেশের প্রধান খাদ্যপণ্যগুলোর আমদানিতে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে চাল, গম, পাম অয়েল ও সয়াবিন তেলের আমদানি পরিমাণ ও ব্যয়—দুই ক্ষেত্রেই তীব্র সংকোচন দেখা গেছে। বিপরীতে জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে ৫৩ শতাংশের বেশি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এপ্রিল ২০২৬ মাসের বৈদেশিক বাণিজ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মার্চের তুলনায় এপ্রিলে চাল আমদানির পরিমাণ ৭০ দশমিক ৭০ শতাংশ কমেছে। মার্চে যেখানে ২ লাখ ১৫ হাজার ৪৩৮ টন চাল আমদানি হয়েছিল, এপ্রিলে তা নেমে এসেছে মাত্র ৬৩ হাজার ১২৩ টনে।
চালের আমদানির সঙ্গে ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। মার্চে চাল আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। এক মাসের ব্যবধানে সেই ব্যয় কমে এপ্রিলে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩৬২ কোটি টাকায়।
সবচেয়ে বড় ধস নেমেছে পাম অয়েল আমদানিতে। মার্চে ২ লাখ ১৫ হাজার ৫৫০ টন পাম অয়েল আমদানি হলেও এপ্রিলে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫৯ হাজার ৬৫৭ টনে। অর্থাৎ এক মাসেই আমদানি কমেছে ৭২ দশমিক ৩২ শতাংশ। পাম অয়েল আমদানিতে ব্যয়ও একইভাবে কমেছে। মার্চে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। এপ্রিলে তা নেমে এসেছে প্রায় ৮৫৮ কোটি টাকায়।
সয়াবিন তেলের ক্ষেত্রেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। মার্চের তুলনায় এপ্রিলে সয়াবিন তেলের আমদানি প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। ব্যয়ও প্রায় ১ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা থেকে কমে ৯৫৭ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
দুই ধরনের ভোজ্যতেল মিলিয়ে মার্চে আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৪ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা। এপ্রিলে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮১৫ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক মাসেই ভোজ্যতেল আমদানির ব্যয় কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ।
প্রধান খাদ্যশস্য গম আমদানিতেও একই চিত্র দেখা গেছে। মার্চে প্রায় ১১ লাখ ৯২ হাজার টন গম আমদানি হলেও এপ্রিলে তা কমে প্রায় ৬ লাখ ৩৬ হাজার টনে নেমে এসেছে। পরিমাণের হিসেবে এই পতন প্রায় ৪৭ শতাংশ। অর্থমূল্যের দিক থেকেও গম আমদানিতে বড় সংকোচন হয়েছে। মার্চে গম আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৪ হাজার ১২৮ কোটি টাকা। এপ্রিলে সেই ব্যয় কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকায়।
অন্যদিকে খাদ্যপণ্য আমদানি কমলেও দেশের মোট আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এপ্রিল মাসে পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা, যা আগের মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে জ্বালানি, রাসায়নিক, লোহা-ইস্পাত ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি থেকে।
শুধু পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানিতেই এপ্রিল মাসে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। মার্চের তুলনায় এ খাতে ব্যয় বেড়েছে ৫৩ দশমিক ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ আমদানির অগ্রাধিকার খাদ্যপণ্যের পরিবর্তে জ্বালানি ও শিল্প খাতের দিকে সরে গেছে বলে পরিসংখ্যানে প্রতিফলিত হয়েছে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে দেশের পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ৪৯ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা। বিপরীতে পণ্য আমদানিতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা। ফলে মাসটিতে পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। পণ্য ও সেবা মিলিয়ে মোট বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৬৪ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা।
এপ্রিল মাসে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আমদানির উৎস দেশ হিসেবে চীনের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। দেশটি থেকে প্রায় ২৯ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকার পণ্য আমদানি করা হয়েছে, যা মোট আমদানির প্রায় ২৭ শতাংশ।
বিবিএসের প্রতিবেদনে খাদ্যপণ্য আমদানি কমে যাওয়ার নির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, ঋণপত্র (এলসি) খোলার সীমাবদ্ধতা এবং জ্বালানি আমদানিতে অগ্রাধিকার—এসব কারণ সম্মিলিতভাবে এ পরিস্থিতির পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব কারণ সরকারি প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়নি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এক মাসের তথ্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো না গেলেও চাল, গম ও ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানিতে একযোগে এত বড় পতন সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বাজারে সরবরাহ, মূল্যস্ফীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর চাপ বাড়তে পারে।













