দেশের অর্থনীতিকে আরও স্বচ্ছ, দক্ষ ও উৎপাদনশীল করে তুলতে এবং ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে যত দ্রুত সম্ভব পুরো দেশকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তার মতে, ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে শুধু সেবার গতি বাড়বে না, একই সঙ্গে কমবে দুর্নীতি, সময় ও ব্যয়; বাড়বে অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা এবং সরকারি-বেসরকারি সেবায় মানুষের অংশগ্রহণ।
সোমবার (৬ জুলাই) রাজধানীতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ইনোভেশন শোকেসিং ২০২৫-২৬’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তি এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সুশাসনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। সরকার এমন একটি ডিজিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে চায়, যেখানে ব্যাংকিং, বীমা, পুঁজিবাজার এবং অন্যান্য আর্থিক সেবা মানুষ যেকোনো স্থান থেকে সহজে গ্রহণ করতে পারবেন।
তিনি বলেন, “এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে” ডিজিটাল রূপান্তরের কাজ এগিয়ে নিতে হবে। কারণ মানুষের সরকারি ও আর্থিক সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া যত সহজ হবে, অর্থনীতির গতি তত বাড়বে।
অর্থমন্ত্রী জানান, ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে সরকারি সেবায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং মানুষের ভোগান্তি কমানো সম্ভব। ব্যাংক বা সরকারি অফিসে বারবার যাতায়াতের প্রয়োজন কমে গেলে সময় ও অর্থ—দুই-ই সাশ্রয় হবে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য কেবল প্রযুক্তি চালু করা নয়; বরং দেশের সাধারণ মানুষ, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কারিগর, শিল্পীসহ প্রতিটি নাগরিককে এই ডিজিটাল পরিবর্তনের অংশীদার করা।
চলতি বাজেটের প্রসঙ্গ টেনে অর্থমন্ত্রী বলেন, এবারের বাজেটেও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূলধারায় সমাজের প্রতিটি শ্রেণিকে যুক্ত করতে প্রযুক্তিনির্ভর সেবার বিস্তার অপরিহার্য।
ডিজিটাল রূপান্তরের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। অর্থমন্ত্রী জানান, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য বিশ্বে পরিচিত এস্তোনিয়ার অভিজ্ঞতা পর্যালোচনায় সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বর্তমানে দেশটিতে অবস্থান করছে। তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের আর্থিক খাতকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, বিশ্বের সফল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় সময়ক্ষেপণের সুযোগ নেই।
ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী বলেন, নতুন ডিজিটাল সেবা চালু করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কতজন গ্রাহক বাস্তবে সেই সেবা ব্যবহার করছেন।
তিনি নির্দেশনা দিয়ে বলেন, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে তাদের মোট গ্রাহকের কত শতাংশ ডিজিটাল সেবার আওতায় এসেছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। পাশাপাশি শাখা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের গ্রাহকদের ডিজিটাল সেবার সুবিধা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে এবং প্রচারণা চালিয়ে অনলাইনভিত্তিক সেবায় অভ্যস্ত করে তুলতে হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের ব্যাংক, বীমা ও পুঁজিবাজার খাতে উদ্ভাবিত ডিজিটাল সেবাগুলোর পরিধি আরও বাড়াতে হবে। এমন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে একজন মানুষ বাড়িতে বসে, কর্মস্থলে কিংবা চলার পথেও নিরাপদে আর্থিক সেবা গ্রহণ করতে পারেন।
তার মতে, ডিজিটাল সেবার বিস্তার শুধু গ্রাহকের সুবিধাই বাড়াবে না; একই সঙ্গে আর্থিক খাতের দক্ষতা, লেনদেনের গতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তিনি গণমাধ্যমের প্রতিও আহ্বান জানিয়ে বলেন, ডিজিটাল আর্থিক সেবার সুফল সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে সংবাদমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মানুষ যত বেশি প্রযুক্তিনির্ভর সেবার সঙ্গে পরিচিত হবে, দেশের ডিজিটাল রূপান্তরও তত দ্রুত এগিয়ে যাবে।
অনুষ্ঠানে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক সভাপতিত্ব করেন। এতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি, বিভিন্ন ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।













