কেনো নতুন ব্যাংকারদের জন্য ১৪ সপ্তাহের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ

ডিএসজে

দেশের ব্যাংক খাতে আমূল পরিবর্তন ও দক্ষ জনবল গড়ে তোলার লক্ষ্যে নবনিযুক্ত কর্মকর্তাদের জন্য ১৪ সপ্তাহের দীর্ঘমেয়াদি বাধ্যতামূলক ‘ভিত্তিমূলক প্রশিক্ষণ’ (ফাউন্ডেশন ট্রেনিং) চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক ব্যাংকিং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে কর্মকর্তাদের কারিগরি জ্ঞান, পেশাগত নৈতিকতা ও গ্রাহকসেবার মান উন্নয়নে এই কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। বুধবার (৬ মে) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ (বিআরপিডি-১) থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে সকল তফসিলি ব্যাংকের জন্য এই নতুন নির্দেশিকা কার্যকর করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এখন থেকে যেকোনো তফসিলি ব্যাংকে নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের চাকরি স্থায়ী করার পূর্বশর্ত হিসেবে এই প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে হবে। প্রশিক্ষণের মোট মেয়াদ হবে ১৪ সপ্তাহ, যার মধ্যে ন্যূনতম ৮ সপ্তাহ তাত্ত্বিক এবং ৬ সপ্তাহ সরাসরি ব্যবহারিক বা অন-দ্য-জব ট্রেনিং হিসেবে বিবেচিত হবে। মূলত ব্যাংকিং খাতের পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে এবং কর্মকর্তাদের আইনি ও প্রযুক্তিগত ভিত্তি মজবুত করতেই এই ‘নবনিযুক্ত তফসিলি ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভিত্তিমূলক প্রশিক্ষণ নির্দেশিকা’ প্রণয়ন করা হয়েছে।

প্রশিক্ষণ মডিউলে আধুনিক ব্যাংকিংয়ের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সামষ্টিক অর্থনীতি, আর্থিক বিশ্লেষণ, ট্রেজারি ব্যবস্থাপনা, এসএমই ও কৃষিঋণ এবং শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং। বর্তমান সময়ের সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় তথ্যপ্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল ব্যাংকিং ও মোবাইল আর্থিক সেবার (এমএফএস) ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এছাড়া ব্যাংক কোম্পানি আইন, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্টসহ সংশ্লিষ্ট আইনগুলো সম্পর্কে নিবিড় ধারণা দেওয়া হবে এই প্রশিক্ষণে।

ভিত্তিমূলক এই প্রশিক্ষণে তাত্ত্বিক শিক্ষার চেয়ে অংশগ্রহণমূলক ও বাস্তবধর্মী শিক্ষার ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। প্রচলিত বক্তৃতার পাশাপাশি কেস স্টাডি, দলীয় আলোচনা এবং ভিডিও উপস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ব্যবহারের সুবিধার্থে ব্যাংকগুলোকে ‘মক ব্রাঞ্চ’ বা পরীক্ষামূলক শাখা চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যেখানে কর্মকর্তারা কোর ব্যাংকিং সিস্টেমে কোনো ঝুঁকি ছাড়াই লেনদেন অনুশীলনের সুযোগ পাবেন। গ্রাহকসেবা ও নেতৃত্ব গুণের পাশাপাশি আবেগ নিয়ন্ত্রণ (ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স) ও দ্বন্দ্ব ব্যবস্থাপনাকেও প্রশিক্ষণের অংশ করা হয়েছে।

প্রশিক্ষণের একটি অনন্য দিক হলো মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা। নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, কর্মকর্তাদের গ্রামীণ অর্থনীতি সম্পর্কে ধারণা দিতে অন্তত পাঁচ দিনের মাঠপর্যায়ের অবস্থান বাধ্যতামূলক। এই সময়ে কর্মকর্তাদের সরাসরি কৃষি ও ক্ষুদ্র শিল্প প্রকল্প মূল্যায়ন করতে হবে এবং প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। এছাড়া শাখা পর্যায়ে হিসাব খোলা, নগদ ব্যবস্থাপনা ও রেমিট্যান্স কার্যক্রমের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে।

ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারার ক্ষমতাবলে জারিকৃত এই নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে। ব্যাংকগুলো চাইলে নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র অথবা অন্য ব্যাংকের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এই কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। তবে প্রশিক্ষণ শেষে নির্ধারিত মান অর্জন করতে পারলেই কেবল কর্মকর্তাদের স্থায়ী নিয়োগের পথ প্রশস্ত হবে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই উদ্যোগের ফলে ব্যাংক খাতে সুশাসন ফিরবে এবং ভবিষ্যতে আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও সেবামুখী ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top