বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে একটি নীরব কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। গ্রাহকরা আগের মতো স্থায়ী আমানত (এফডিআর) ভেঙে খরচ মেটানোর বদলে এখন সেই আমানত বন্ধক রেখেই ঋণ নিচ্ছেন। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে স্থায়ী আমানত ও অন্যান্য সঞ্চয়ের বিপরীতে ব্যক্তিগত ঋণ বেড়েছে ৫ হাজার ৩৪ কোটি টাকা, যা ভোক্তা ঋণের প্রায় সব খাতের তুলনায় সবচেয়ে বড় বৃদ্ধি।
ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি শুধু ঋণের পরিসংখ্যান নয়; বরং নগদ অর্থের সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বিনিয়োগে স্থবিরতার প্রতিফলন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে স্থায়ী আমানত ও অন্যান্য সঞ্চয়ের বিপরীতে ব্যক্তিগত ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা। মাত্র এক প্রান্তিক পর, চলতি বছরের মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৬২৫ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসেই এ ধরনের ঋণ বেড়েছে প্রায় ২২ শতাংশ।
ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকদের মতে, সাধারণত গ্রাহকের হাতে নগদ অর্থের প্রয়োজন হলে তিনি প্রথমে এফডিআর ভেঙে অর্থ তুলে নেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে অনেক গ্রাহক সেই পথ এড়িয়ে যাচ্ছেন। কারণ মেয়াদপূর্তির আগে এফডিআর ভাঙলে সুদের একটি অংশ হারানোর আশঙ্কা থাকে। আবার অনেকের বিশ্বাস, ভবিষ্যতে সুদের হার কমে গেলে বর্তমানে উচ্চ সুদে করা আমানত ধরে রাখাই লাভজনক হবে। ফলে আমানত অক্ষুণ্ন রেখে তার বিপরীতে ঋণ নেওয়াই তাঁদের কাছে বেশি সুবিধাজনক মনে হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের আরেকটি ব্যাখ্যা হলো, দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মধ্যবিত্ত ও বেতনভোগী পরিবারের সঞ্চয় দ্রুত কমে এসেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং বাসস্থান ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার অতিরিক্ত নগদ অর্থের প্রয়োজন অনুভব করছে। কিন্তু সঞ্চয় পুরোপুরি ভেঙে ফেলতে না চাওয়ায় তারা এফডিআর বন্ধক রেখে ব্যাংকঋণের পথ বেছে নিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, শুধু এফডিআর-বন্ধকী ঋণই নয়, সামগ্রিক ভোক্তা ঋণও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২৫ সালের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে মোট ভোক্তা ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৩৩৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। তিন মাস আগে এর পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫১ হাজার ৭৩৮ কোটি ১১ লাখ টাকা। ফলে এক প্রান্তিকেই ভোক্তা ঋণ বেড়েছে ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এই ঋণ বেড়েছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা।
ভোক্তা ঋণের বিভিন্ন খাত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আবাসন ঋণ বেড়ে ৩২ হাজার কোটি টাকা, বেতননির্ভর ঋণ ২৩ হাজার ২৩৫ কোটি টাকা, ক্রেডিট কার্ডভিত্তিক ঋণ ১৩ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা, জমি কেনার ঋণ ৭ হাজার ১৮১ কোটি টাকা এবং মোটরগাড়ি ও মোটরসাইকেল কেনার ঋণ ৬ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অন্যদিকে গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি কেনার ঋণ সামান্য কমেছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে ভোগের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে।
ব্যাংকারদের ভাষ্য, ভোক্তা ঋণের চরিত্রও এখন বদলে যাচ্ছে। আগে এই ঋণের বড় অংশ ব্যবহৃত হতো টেলিভিশন, ফ্রিজ কিংবা অন্যান্য গৃহস্থালি পণ্য কেনায়। এখন শিক্ষা, চিকিৎসা, বিয়ে, পেশাগত ব্যয়, এমনকি দৈনন্দিন সংসার পরিচালনার মতো প্রয়োজনেও ব্যক্তিগত ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, স্বল্প অঙ্কের ঋণের চাহিদা বৃদ্ধি এবং ব্যাংকগুলোর আগ্রাসী বিপণন কার্যক্রম ভোক্তা ঋণের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। তাঁর মতে, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি দুর্বল হয়ে পড়া এবং করপোরেট ঋণে ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যাংক এখন ভোক্তা অর্থায়নে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এতে ঋণ দ্রুত বিতরণ করা যায় এবং ঋণ পোর্টফোলিওতেও বৈচিত্র্য আসে।
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই প্রবণতার একটি উদ্বেগজনক দিকও রয়েছে। যদি পরিবারগুলো ক্রমাগত সঞ্চয়কে বন্ধক রেখে দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করতে বাধ্য হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তাকে দুর্বল করতে পারে। একই সঙ্গে ব্যাংকঋণের বড় অংশ যদি উৎপাদনশীল শিল্পের পরিবর্তে ভোগ ব্যয়ের দিকে প্রবাহিত হয়, তাহলে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এফডিআর-বন্ধকী ঋণের দ্রুত বৃদ্ধি আপাতদৃষ্টিতে ব্যাংকিং খাতের জন্য ইতিবাচক মনে হলেও এর অন্তর্নিহিত বার্তা ভিন্ন। এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে অনেক পরিবার সঞ্চয় অক্ষুণ্ন রাখতে চাইছে, কিন্তু একই সঙ্গে সেই সঞ্চয়কে ভরসা করেই বর্তমানের নগদ অর্থের সংকট মোকাবিলা করছে। অর্থাৎ, সঞ্চয় এখন কেবল ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নয়, বর্তমানের জীবনযাত্রা টিকিয়ে রাখারও একটি অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে।













