দেশের ব্যাংকিং খাতে বিশেষ ছাড়ের মাধ্যমে ঋণ শ্রেণীকরণ বা শ্রেণীকরণে কৃত্রিম স্বস্তি ফেরানোর চেষ্টা দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না, বরং তিন মাসের ব্যবধানে আবারও বিপজ্জনকভাবে ৬ লাখ কোটি টাকার মাইলফলকের দিকে ধাবিত হচ্ছে সামগ্রিক খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের সর্বশেষ স্থিতিভিত্তিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিক (জানুয়ারি-মার্চ) শেষে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকে মোট শ্রেণীকৃত বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
মঙ্গলবার (২ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের কাছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেন।
বিগত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিকে বিশেষ নীতিমালার আওতায় ঢালাও পুনঃতফসিলের মাধ্যমে এই অঙ্ক ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি ৯২ লাখ টাকায় নামিয়ে আনা সম্ভব হলেও মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে তা আবারও ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা বেড়েছে।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৫ সালের জুন প্রান্তিকে প্রথমবারের মতো খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করে রেকর্ড ৬ লাখ ৮ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকায় পৌঁছায়, যা মোট ঋণের ৩৪.৪ শতাংশ। পরবর্তী সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে সুশাসনের অভাব ও আদায় সংকটে তা আরও বেড়ে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা বা মোট ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল।
এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পলিসি সাপোর্টের কারণে ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের গ্রস হার ৩০.৬০ শতাংশে নেমে এলেও চলতি বছরের মার্চে তা ১.৬৬ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে আবারও ৩২.২৬ শতাংশে উঠে এসেছে। এক বছরের ব্যবধানে এই খাতের পরিস্থিতি কতটা শোচনীয় হয়েছে তা স্পষ্ট হয় যখন দেখা যায়, মার্চ ২০২৫-এ খেলাপি ঋণের গ্রস হার ছিল মাত্র ২৪.১৩ শতাংশ। অর্থাৎ, বছর ব্যবধানে খেলাপি ঋণের গ্রস হার একধাক্কায় ৮.智慧 শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে।
আর্থিক খাতের রক্ষিত প্রভিশন ও স্থগিত সুদের সাথে সমন্বয় (নেট অফ) করার পর নিট শ্রেণীকৃত ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ১৫.০১ শতাংশে, যা গত ডিসেম্বরে ছিল ১৩.৯৩ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শ্রেণীকৃত এই বিশাল অঙ্কের মধ্যে আইনি সংজ্ঞায় প্রকৃত ‘খেলাপি ঋণ’-এর পরিমাণই হলো ৫ লাখ ্ম৬৪ হাজার ১০৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩০.৯২ শতাংশ। গত ডিসেম্বরের তুলনায় খেলাপি ঋণের এই নিজস্ব অঙ্কটিই বেড়েছে ১৯,২৭৩.৭৬ কোটি টাকা।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মোট শ্রেণীকৃত ঋণের মধ্যে সিংহভাগ অর্থাৎ ৯৩.৬৯ শতাংশই এখন ‘মন্দ বা ক্ষতিজনক’ ঋণে পরিণত হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ৫ লাখ ৫১ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এছাড়া খেলাপি হওয়ার অপেক্ষায় থাকা ‘স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্ট’ বা এসএমএ-তে আটকে আছে আরও ১ লাখ ৩২ হাজার ১১৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনের ব্যাংক ক্লাস্টার-ভিত্তিক তথ্য বিশদভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেই খেলাপি ঋণের মূল স্থিতি এখন সবচেয়ে বড়। দেশের ৪৩টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে মোট শ্রেণীকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১৬ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, যা তাদের বিতরণকৃত ঋণের ৩০.১১ শতাংশ। গত তিন মাসে কেবল বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেই খেলাপি বেড়েছে ২৬ হাজার ৯০২ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, ৬টি রাষ্ট্র-মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা。 সরকারি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের ৪৫.৮৫ শতাংশই এখন খেলাপি, যা গত ডিসেম্বরে ছিল ৪৪.৪৪ শতাংশ। এছাড়া ৩টি বিশেষায়িত ব্যাংকে ১৯ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা (৪০.৭২ শতাংশ) এবং ৯টি বিদেশি ব্যাংকে ৩,২৬২ কোটি টাকা (৪.৮২ শতাংশ) শ্রেণীকৃত অবস্থায় রয়েছে।
ব্যাংকার ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসন আমলে ব্যাংক খাতে সংঘটিত নজিরবিহীন অনিয়ম, ব্যাপক জালিয়াতি, জঘন্য প্রতারণা এবং উচ্চমাত্রার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির সরাসরি প্রভাবেই আজকের এই খেলাপি ঋণের পাহাড় তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ এবং হল-মার্ক গ্রুপসহ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কয়েকটি নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং ন্যাশনাল ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকে সংঘটিত বড় বড় ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনার কারণে খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়।
২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার যখন প্রথম দায়িত্ব নেয়, তখন দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। তবে ২০২৪ সালের জুনে তারা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে সাড়ে ১৫ বছরে তা অবিশ্বাস্য গতিতে বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকায়।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংক খাতের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রকৃত ও বাস্তব চিত্র জনসমক্ষে দেখানো শুরু হয়। একই সাথে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত অনেক বড় বড় ঋণগ্রহীতা ও ব্যবসায়ী হঠাৎ করে জনসমক্ষে আসা বন্ধ করে দেওয়ায় এবং তাদের অনেক প্রতিষ্ঠান নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় খেলাপি ঋণ হুহু করে বাড়তে থাকে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে এসে ঋণের দুর্বল রিকভারি বা আদায় সংকটের কারণে খেলাপি ঋণের সেই পুরনো রূপ আবারও ফিরে এসেছে, যা নতুন সরকারের জন্য বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ।













