জমকালো সমাপনী আর পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে পর্দা নামল ৩০তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার। তবে মেলার সমাপ্তি ঘটলেও গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান ও বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণে একটি প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে—বাণিজ্য মেলা কি তার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে কেবল একটি ‘আঞ্চলিক বাজার’ বা ‘পিকনিক স্পটে’ পরিণত হচ্ছে?
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় বিদেশিদের অংশগ্রহণ ধারাবাহিকভাবে কমছে। গত বছরের তুলনায় রপ্তানি আদেশ বাড়লেও তা এখনো ২০ বছর আগের অবস্থানেই রয়ে গেছে। স্থানীয় কেনাবেচাও একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে।
শনিবার পূর্বাচলের বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে মেলার সমাপ্তি ঘোষণা করেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। এবারের মেলায় দেশি-বিদেশি মোট ৩২৯টি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করেছে, যার মধ্যে ১১টি বিদেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলো ছয়টি দেশ থেকে এসেছে।
সংকুচিত হচ্ছে বিদেশি অংশগ্রহণ
বাণিজ্য মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, ধারাবাহিকভাবে মেলায় বিদেশি অংশগ্রহণ কমছে।
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ২০২০ সালে যেখানে মেলার ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২১টি দেশ অংশ নিয়েছিল, সেখানে ২০২২ সালে তা নেমে আসে ১১টিতে। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা ছিল মাত্র ৬টি, যা ২০২৫ সালে ৯টিতে উন্নীত হয়েছিল। তবে চলতি ২০২৬ সালের মেলায় বিদেশি অংশগ্রহণকারী দেশ আবারও ছয়টিতে নেমে আসে।
এক সময় ইউরোপ বা আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলোর সরব উপস্থিতি থাকলেও এখন মেলা কেবল দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গুটিকয়েক দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। মেলার নাম ‘আন্তর্জাতিক’ হলেও এর বৈশ্বিক চরিত্র এখন হুমকির মুখে।
রপ্তানি আদেশেও নেই বড় উল্লম্ফন
মেলার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বিদেশি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে দেশের রপ্তানি ঝুলি সমৃদ্ধ করা। কিন্তু এখানেও চিত্রটি বেশ ধূসর। ২০২৬ সালে রপ্তানি আদেশ মিলেছে ১৭.৯৮ মিলিয়ন ডলার।
গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে এটি ছিল ১৬.০৬ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে নগণ্য। আরও পেছনে তাকালে দেখা যায়, আজ থেকে ২১ বছর আগে ২০০৫ সালের মেলায় রপ্তানি আদেশ ছিল প্রায় ১৬ মিলিয়ন ডলার।
দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও উৎপাদন ক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়লেও বাণিজ্য মেলা থেকে প্রাপ্ত রপ্তানি আদেশ সেই অনুপাতে এক জায়গাতেই ঘুরপাক খাচ্ছে। ১৭-১৮ মিলিয়ন ডলারের এই গণ্ডি থেকে বের হতে না পারা নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চিন্তার কারণ।
স্থানীয় কেনাবেচার প্রবৃদ্ধিও মন্থর
মেলায় স্থানীয় কেনাবেচা নিয়েও খুব একটা আশাবাদী হওয়ার সুযোগ নেই। এবারের মেলায় বিক্রি হয়েছে ৩৯৩ কোটি টাকার পণ্য, যা গত বছরের তুলনায় মাত্র ৩.৪২ শতাংশ বেশি। দেশের মুদ্রাস্ফীতি ও পণ্যের দাম বাড়ার হার বিবেচনায় নিলে এই ৩.৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কার্যত স্থবিরতারই ইঙ্গিত দেয়।
কেন এই স্থবিরতা?
ডিএসজে-এর অনুসন্ধানে তিনটি প্রধান কারণ উঠে এসেছে।
ভেন্যু ও দূরত্ব: মেলাটি আগারগাঁও থেকে পূর্বাচলে স্থানান্তরের পর সাধারণ দর্শনার্থী ও বিদেশি ক্রেতাদের জন্য যাতায়াত এখনো একটি বড় প্রতিবন্ধকতা।
মান্ধাতা আমলের বিপণন: মেলাকে এখনো সস্তা প্লাস্টিক পণ্য ও ক্রোকারিজের বিশাল সমারোহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হাই-টেক বা প্রিমিয়াম পণ্যের ব্র্যান্ডিং এখানে অনুপস্থিত।
উদ্ভাবনের অভাব: প্রতি বছর একই ঘরানার পণ্য ঘুরেফিরে আসছে। এবারের মেলায় ‘ব্লু টি’ বা ‘মসলিন’-এর মতো হাতেগোনা দু-একটি পণ্য ছাড়া উদ্ভাবনী কোনো পণ্যের বড় চমক ছিল না।
একাধিক দর্শনার্থীর মতে, বাণিজ্য মেলা ৩০ বছরে পা দিলেও এর কাঠামো রয়ে গেছে সেকেলে। যদি দ্রুত মেলার আন্তর্জাতিকীকরণ ও পণ্যের বৈচিত্র্য আনা না যায়, তবে এটি কেবল একটি বার্ষিক ঘরোয়া মেলায় পরিণত হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা ডিএসজে প্রতিবেদককে বলেন, ১৭.৯৮ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আদেশে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই, কারণ বৈশ্বিক বাণিজ্যের তুলনায় এই অঙ্ক অত্যন্ত নগণ্য।













