বৈধ বাণিজ্যের আড়ালে অবৈধ অর্থের প্রবাহ আর অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে অর্থপাচারের নতুন পথ—দুই দিকেই একসঙ্গে নজরদারি বাড়াচ্ছে সরকার। আমদানি-রপ্তানির আড়ালে অর্থপাচারের ঝুঁকি চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে নতুন কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি হুন্ডির অর্থের গতিপথ বন্ধ করতে অনলাইন জুয়া, ভার্চুয়াল মুদ্রা ও অনলাইন লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব শনাক্ত করে তা বন্ধ করছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থপাচার বা ট্রেডবেজ মানি লন্ডারিং ঠেকাতে প্রস্তাবিত কমিটিতে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি ব্যাংক, ব্যবসায়ী ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের রাখা হবে। এতে বিএফআইইউ, বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, কাস্টমস, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের প্রতিনিধিরা যুক্ত থাকবেন।
কমিটির মূল লক্ষ্য হবে বাণিজ্যিক লেনদেনের মধ্যে অর্থপাচারের ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানো এবং সন্দেহজনক লেনদেনের ক্ষেত্রে দ্রুত ও সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া। অর্থাৎ কোনো পণ্য আমদানি-রপ্তানি, মূল্য নির্ধারণ বা বৈদেশিক বাণিজ্যিক লেনদেনের আড়ালে অর্থ দেশের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে তা শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়ানোই হবে এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার ঠেকাতে সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে থাকা তথ্য এক জায়গায় এনে বিশ্লেষণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ আমদানি-রপ্তানির তথ্য একদিকে, ব্যাংকিং লেনদেন অন্যদিকে এবং শুল্ক-করসংক্রান্ত তথ্য আলাদা থাকলে একটি লেনদেনের পুরো চিত্র শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। নতুন কমিটির মাধ্যমে এসব তথ্যের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এদিকে হুন্ডির মাধ্যমে অর্থপাচারের নতুন কৌশল নিয়েও উদ্বিগ্ন বিএফআইইউ। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, হুন্ডির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা অর্থ স্থানান্তরের বিকল্প মাধ্যম হিসেবে অনলাইন জুয়া, অনলাইনভিত্তিক ট্রেডিং এবং ভার্চুয়াল মুদ্রার লেনদেন ব্যবহার করছে।
এ কারণে অনলাইন জুয়া ও অবৈধ আর্থিক কার্যক্রমে ব্যবহৃত ব্যাংক হিসাব এবং মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব শনাক্ত করে বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব হিসাব শুধু জুয়ার লেনদেনের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, নাকি এর মাধ্যমে দেশের বাইরে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার একটি চ্যানেল তৈরি হচ্ছে—সেটিও নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে।
এরই অংশ হিসেবে গতকাল রোববার অন্তত ২৫০টি মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাব বন্ধ করেছে বিএফআইইউ। সংস্থাটির চলমান অভিযানে গত এক মাসে সব মিলিয়ে অন্তত ২৬ হাজার হিসাব বন্ধ করা হয়েছে। এসব হিসাবের মধ্যে অনলাইন জুয়া, অনলাইন ট্রেডিং, ভার্চুয়াল মুদ্রা এবং হুন্ডিসংশ্লিষ্ট লেনদেনের ঝুঁকি পাওয়া হিসাব রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
তবে হিসাব বন্ধের এই অভিযানকে শুধু অনলাইন জুয়া বন্ধের উদ্যোগ হিসেবে দেখছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এর সঙ্গে দেশের বাইরে অর্থ পাচারের সম্ভাব্য পথ বন্ধ করার বিষয়টিও যুক্ত।
বিশেষ করে হুন্ডি চক্র যদি ডিজিটাল লেনদেনের মাধ্যমে দেশের ভেতরে অর্থ সংগ্রহ করে এবং বিদেশে থাকা সমপরিমাণ অর্থ সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছে দেয়, তাহলে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে অর্থ স্থানান্তরের একটি কার্যকর নেটওয়ার্ক তৈরি হয়। সেই নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত ডিজিটাল হিসাব শনাক্ত করাই এখন নজরদারির অন্যতম লক্ষ্য।
অনলাইন জুয়ার ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঝুঁকি দেখছে বিএফআইইউ। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অর্থ জমা ও উত্তোলনের জন্য ব্যবহৃত স্থানীয় ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাবগুলোকে নজরদারিতে আনা হচ্ছে। সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত হলে সংশ্লিষ্ট হিসাবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে ট্রেডবেজ মানি লন্ডারিং প্রতিরোধে প্রস্তাবিত নতুন কমিটি অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণে আরও সমন্বিত কাঠামো তৈরির উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতদিন বিভিন্ন সংস্থা নিজ নিজ এখতিয়ার অনুযায়ী বাণিজ্য, ব্যাংকিং, শুল্ক ও করসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলেও প্রস্তাবিত কাঠামোয় এসব পক্ষকে একই সমন্বয় ব্যবস্থার আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্যের প্রকৃত মূল্য, ঘোষিত মূল্য, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক লেনদেন এবং শুল্ক-করসংক্রান্ত তথ্যের মধ্যে অসঙ্গতি থাকলে তা অর্থপাচারের সম্ভাব্য সংকেত হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।
ব্যবসায়ী ও ব্যাংকারদেরও এই প্রক্রিয়ার অংশ করার পরিকল্পনা থাকায় সন্দেহজনক বাণিজ্যিক লেনদেন চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের তথ্যও কাজে লাগানো সম্ভব হবে।












