বেতন বাড়ছে, তবে এক লাফে নয়। নিম্নগ্রেডের কর্মচারীদের বেশি অগ্রাধিকার দিয়ে দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হবে নতুন জাতীয় বেতনস্কেল। এতে সরকারি চাকরিতে সর্বনিম্ন প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে দ্বিগুণ হয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হবে।
একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের পেনশন বৈষম্য কমাতে স্ল্যাবভিত্তিক নিট পেনশন ৫৫ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রথমবার মাসিক ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
সোমবার (৩১ আগস্ট) অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে জাতীয় বেতনস্কেল ২০২৬ অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সঙ্গে নতুন বেতনস্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য যৌথবাহিনী নির্দেশাবলী ২০২৬ অনুমোদন করা হয়েছে। অনুমোদিত কাঠামো ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর ধরা হলেও বেতন ও ভাতার বাস্তব প্রয়োগ হবে পর্যায়ক্রমে।
নতুন কাঠামোয় সরকারি কর্মচারীদের বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হয়েছে। তবে প্রতিটি গ্রেডের মূল বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। বেতনস্কেলের বিস্তারিত তুলনামূলক তালিকায় দেখা যায়, ১ম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। আর ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে।
তবে বেতন বৃদ্ধির হার সব গ্রেডে সমান নয়। সর্বনিম্ন গ্রেডে মূল বেতন বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ—প্রায় ১৪২ শতাংশ। এরপর ১৯তম গ্রেডে ১৪১ শতাংশ, ১৮তম গ্রেডে ১৩৯ শতাংশ, ১৭তম গ্রেডে ১৩৮ শতাংশ এবং ১৫ ও ১৬তম গ্রেডে ১৩৫ শতাংশ করে বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিপরীতে ১ম থেকে ১১তম গ্রেডে মূল বেতন বৃদ্ধির হার মূলত ১০০ শতাংশের মধ্যে রাখা হয়েছে। ১২তম থেকে ১৪তম গ্রেডে বৃদ্ধি হয়েছে যথাক্রমে ১১৫, ১১৮ ও ১৩০ শতাংশ।
অর্থাৎ নতুন বেতন কাঠামোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো নিচের দিকের গ্রেডগুলোতে তুলনামূলক বেশি বেতন বৃদ্ধি। সরকারের ভাষ্য, ন্যায্যতা ও স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনা করেই এ পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে।
এই পরিবর্তনের ফলে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের ব্যবধানও কিছুটা কমবে। বিদ্যমান কাঠামোয় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ছিল ১:১.৯৪৫। নতুন স্কেলে তা কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে। সরকারের হিসাবে, এতে বেতন কাঠামোর অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য কিছুটা বাড়বে।
নতুন বেতনস্কেলের আরেকটি বড় দিক পেনশন। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এক গ্রেড এক পেনশন বা ‘ওয়ান র্যাঙ্ক ওয়ান পেনশন’ পদ্ধতি সামরিক ও অসামরিক উভয় ক্ষেত্রে চালুর কথা থাকলেও এর তাৎক্ষণিক বাস্তবায়ন থেকে সরে এসেছে সরকার। বিপুল আর্থিক ব্যয় এবং ২০১৯ সালের আগের অসামরিক অবসরপ্রাপ্তদের তথ্যের ঘাটতির কারণে এই ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এর পরিবর্তে এখনই কম নিট পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্তদের জন্য স্ল্যাবভিত্তিক পেনশন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মাসে ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন বাড়বে ১০০ শতাংশ। ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশনধারীদের বৃদ্ধি হবে ৭৫ শতাংশ। ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশনধারীদের ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি দেওয়া হবে।
ফলে বহু বছর আগে অবসরে যাওয়া এবং তুলনামূলক কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিরাই এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবেন। সরকারের যুক্তি, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সময়ে প্রবীণ অবসরপ্রাপ্তদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামোয় সরকারি কর্মচারীদের পরিবারের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানদের জন্যও প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালু করা হচ্ছে। প্রতি সন্তানের জন্য মাসে ৩ হাজার টাকা করে এই ভাতা দেওয়া হবে।
ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যয়ের বিষয়টিও নতুন কাঠামোয় যুক্ত হয়েছে। এতদিন শুধু ৫ম গ্রেডের কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পাওয়ার সুযোগ পেতেন। নতুন বেতনস্কেলে সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারীকে মোবাইল ভাতার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে নতুন বেতনস্কেল অনুমোদিত হলেও পুরো সুবিধা একসঙ্গে কার্যকর হবে না। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮—এই দুই অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।
এ ক্ষেত্রে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে মূল বেতন মোট তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। অন্যদিকে ভাতাগুলো ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে একযোগে কার্যকর হবে। পেনশনভোগীদের নিট পেনশন বৃদ্ধিও একই ধরনের ধাপে কার্যকর হবে।
জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য অবশ্য পৃথক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে গঠিত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস বেতনস্কেল অনুমোদন করা হবে। সেটিও ১ জুলাই ২০২৬ থেকে জাতীয় বেতনস্কেলের মতো ধাপে ধাপে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত রয়েছে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, নতুন বেতনস্কেলের সুবিধা পাবেন প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী। এর সঙ্গে যুক্ত হবেন সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী। সব মিলিয়ে অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয়ের পরিমাণ আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এই ব্যয়ের সংস্থান মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর আওতায় সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর বাজেটে রাখা হয়েছে।
বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তটি সরকারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পুরো বেতনস্কেল একবারে কার্যকর করলে সরকারি ব্যয়ের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত আয় মানুষের হাতে একসঙ্গে চলে গেলে সামগ্রিক চাহিদা ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। সরকার তাই দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে সেই চাপ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।
জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ এবং সশস্ত্রবাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর প্রতিবেদন পাওয়ার পর গঠিত সচিব কমিটির সুপারিশ পর্যালোচনা করেই নতুন কাঠামো অনুমোদন করা হয়েছে। বেতন নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মচারীদের জীবনমান এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করা হয়েছে।
সরকারের প্রত্যাশা, নতুন বেতনস্কেল শুধু সরকারি কর্মচারীদের আয় বাড়াবে না; বরং তাদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্দীপনা বাড়িয়ে আরও দক্ষ ও জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে মূল্যস্ফীতি কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় অর্থনীতিতে কতটা কার্যকরভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হয় তার ওপর।
অর্থ বিভাগ এখন অনুমোদিত কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে। সেখানে বেতন নির্ধারণের পদ্ধতি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন ও অবসর-পরবর্তী অন্যান্য সুবিধার বিস্তারিত বিধান থাকবে। অর্থাৎ আজকের অনুমোদনের পর এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয়ের এই বড় সিদ্ধান্তকে মূল্যস্ফীতি ও সরকারি অর্থব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণযোগ্য চাপ রেখে বাস্তবে কার্যকর করা।












