কোম্পানিকে তালিকাভুক্তিতে বাধ্য করবে বিএসইসি

DSJ Web Photo BSEC
ছবি- ডিএসই

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি কোম্পানির ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিতে চায় না নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। জনস্বার্থে প্রয়োজন হলে কোনো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আসার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা কমিশনের রয়েছে— এখন তা প্রয়োগের কথা জানিয়েছেন বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান।

মাসুদ খান বলেন, সিকিউরিটিজ আইনের ২০ এর ‘এ’ ধারায় জনস্বার্থে কমিশনের কোনো কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আসার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। এই বিধানকে কার্যকর কাঠামোর মধ্যে আনতেই ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট কোম্পানি’ নিয়ে নতুন আইন বা বিধি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির কোম্পানির জন্য পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির আবেদন করা বাধ্যতামূলক করা হবে।

অর্থাৎ, ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট আকার, ব্যবসার ধরন বা জনস্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার ভিত্তিতে কোনো কোম্পানি নির্ধারিত শ্রেণিতে পড়লে শুধু মালিকপক্ষের অনাগ্রহের কারণে পুঁজিবাজারের বাইরে থাকার সুযোগ নাও থাকতে পারে। বিএসইসির পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের পুঁজিবাজারে ভালো ও বড় কোম্পানি আনার ক্ষেত্রে এটি হবে একটি মৌলিক নীতিগত পরিবর্তন।

সোমবার (৩১ অক্টোবর) ডিএসই ব্রোকারেজ হাউস অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ) আয়োজিত ‘দ্য কারেন্ট স্টেট অব দ্য বাংলাদেশ ক্যাপিটাল মার্কেট অ্যান্ড ওয়ে ফরওয়ার্ড’ শীর্ষক উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। অনুষ্ঠানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ, ব্রোকারেজ হাউস, মার্চেন্ট ব্যাংক, সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানসহ পুঁজিবাজারের বিভিন্ন অংশীজনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ধরে ভালো কোম্পানি ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগযোগ্য শেয়ারের সংকট রয়েছে। বড় ও মৌলভিত্তি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান বাজারে না আসায় বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত হওয়ার পাশাপাশি বাজারের গভীরতাও কমেছে। বিএসইসির নতুন উদ্যোগের পেছনে সেই কাঠামোগত দুর্বলতা কাটানোর লক্ষ্য রয়েছে।

বিএসইসি চেয়ারম্যান তাঁর বক্তব্যে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া দ্রুত করার আরেকটি পথের কথাও তুলে ধরেন। একটি কোম্পানি চাইলে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব ও সরাসরি তালিকাভুক্তির সমন্বিত বা হাইব্রিড পদ্ধতিতে বাজারে আসতে পারে বলে জানান তিনি।

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, কোনো কোম্পানি তার মোট মূলধনের ১০ শতাংশ বাজারে আনলে এর ৫ শতাংশ নতুন শেয়ার ছেড়ে মূলধন সংগ্রহ করতে পারে এবং বাকি ৫ শতাংশ বিদ্যমান শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে বাজারে ছাড়তে পারে। তাঁর মতে, এ ধরনের কাঠামো ব্যবহার করা গেলে এক সপ্তাহের মধ্যেই তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এরই মধ্যে দেশের কয়েকটি বড় কোম্পানির সঙ্গে তালিকাভুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে বলেও উল্লেখ করেন।

বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, মার্কেট যখন দেখবে ভালো ভালো কোম্পানি বাজারে আসছে এবং সেই সাথে ডাইরেক্ট লিস্টিং-এর মাধ্যমে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ, সিডিবিএল এবং সিসিবিএল মার্কেটে আসছে, তখন বাজারের সার্বিক পরিস্থিতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন বা আস্থা আসবে।

গত দুই মাসে কমিশনের নেওয়া কয়েকটি পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন মাসুদ খান। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য দীর্ঘদিনের একটি বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল। ফ্লোর প্রাইস চালুর পর আন্তর্জাতিক সূচক নির্মাতা এমএসসিআই বাংলাদেশের সূচক প্রকাশ স্থগিত করেছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন। আগামী নভেম্বর থেকে এমএসসিআই বাংলাদেশের সূচক আবার চালু করবে বলে জানান তিনি।

বিদেশে বাংলাদেশি কোম্পানির তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রেও অগ্রগতির কথা বলেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা বেক্সিমকো ফার্মার লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে জিডিআর তালিকাভুক্তির বিষয়টি সমাধান করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

ব্রোকারেজ হাউসের গ্রাহক হিসাবের ঘাটতি নিয়েও কঠোর হওয়ার বার্তা দিয়েছেন তিনি। বড় ধরনের ঘাটতির ক্ষেত্রে শুধু জরিমানা করে সমস্যার সমাধান হবে না মন্তব্য করে ঝুঁকিভিত্তিক ও আকস্মিক তদারকির ওপর গুরুত্ব দেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। তাঁর মতে, আগে থেকে পরিদর্শনের খবর দেওয়া হলে অনিয়ম সাময়িকভাবে আড়াল করার সুযোগ থাকে। তাই বিএসইসি ও ডিএসইর সমন্বয়ে নিয়মিত আকস্মিক পরিদর্শনের প্রয়োজন রয়েছে।

অনুষ্ঠানে ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার বাজারের স্বল্পমেয়াদি ওঠানামার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তনের ওপর জোর দেন। ডিএসই চেয়ারম্যান বলেন, শুধু সূচকের উত্থান-পতন নিয়ে ব্যস্ত থাকলে হবে না; বাজারের দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি শক্ত করতে হবে। ডিএসইর পক্ষ থেকে বিএসইসির সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্ন সংস্কারমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

পুঁজিবাজারের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে স্ট্রেইট-থ্রু প্রসেসিং এবং টি+১ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালুর প্রস্তুতির কথাও তুলে ধরা হয়। ম্যাচিং ইঞ্জিন ও অর্ডার ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার কাজ চলছে। কয়েক মাসের মধ্যে টি+১ চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানান ডিএসই চেয়ারম্যান। পাশাপাশি ওপেন-এন্ডেড মিউচুয়াল ফান্ডের লেনদেন শিগগির শুরু করার কথাও জানানো হয়।

তবে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সাবেক চেয়ারম্যান মারুফ খান পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য, স্টক এক্সচেঞ্জের ডিমিউচুয়ালাইজেশনের সময় পাঁচ ও ১০ বছর মেয়াদি যে রোডম্যাপ তৈরি হয়েছিল, সেখানে একাধিক নতুন পণ্য চালুর পরিকল্পনা ছিল। এক যুগেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাজার এখনো সীমিত কয়েকটি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। ডিমিউচুয়ালাইজেশনের প্রত্যাশিত ফল কোথায়- এমন প্রশ্ন রাখেন তিনি।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top