নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্ট কী, কেন বাড়ছে এই হিসাব?

DSJ Web Photo StudentBanking
প্রতীকী ছবি (AI দ্বারা তৈরি)

মাত্র ১০, ৫০ বা ১০০ টাকা দিয়ে ব্যাংক হিসাব খোলা যাচ্ছে—আর এমন হিসাবের সংখ্যাও বাড়ছে দ্রুত। ২০২৬ সালের জুন শেষে দেশে ১০, ৫০ ও ১০০ টাকায় খোলা নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৯৫ লাখ ৪৭ হাজার ৮৯৭টি। তিন মাসে এসব হিসাব বেড়েছে ০.৭৯ শতাংশ এবং এক বছরে ২.৯৩ শতাংশ। একই সময়ে এসব হিসাবে আমানত বেড়েছে এক বছরে ৯.২০ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন বিভাগের ‘নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন (এপ্রিল-জুন ২০২৬)’ অনুযায়ী, জুন শেষে এসব হিসাবে জমা রয়েছে ৫ হাজার ৪৯০ কোটি ৯২ লাখ ৩০ হাজার টাকা। স্টুডেন্ট ব্যাংকিং এবং পথশিশু ও কর্মজীবী শিশুদের হিসাব যুক্ত করলে এ ধরনের আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক হিসাবের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩ কোটি ৬৬ লাখ ৪৮ হাজার ১১৯টি এবং মোট আমানত ৯ হাজার ১০ কোটি ১৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা।

নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্ট মূলত স্বল্পআয়ের ও প্রান্তিক মানুষের জন্য সহজ শর্তে খোলা ব্যাংক হিসাব। অল্প টাকা দিয়ে হিসাব খোলার সুযোগ থাকায় কৃষক, শ্রমিক, নিম্নআয়ের মানুষ এবং ব্যাংকিংয়ের বাইরে থাকা জনগোষ্ঠী সহজেই আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্ত হতে পারেন।

এই হিসাবের গুরুত্ব শুধু টাকা জমা রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি ভাতা, বেতন-ভাতা, ভর্তুকি ও রেমিট্যান্স গ্রহণের মাধ্যম হিসেবেও এসব হিসাব ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্ট আর শুধু সঞ্চয়ের হিসাব নয়; এটি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অন্যতম অবকাঠামো হয়ে উঠেছে।

কারা বেশি হিসাব খুলছেন?

নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্টের সবচেয়ে বড় অংশ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগী ও কৃষকদের। জুন শেষে সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধাভোগীদের নামে রয়েছে ১ কোটি ৮ লাখ ৬৮ হাজার ৭৯৮টি হিসাব, যা মোটের ৩৬.৭৮ শতাংশ। কৃষকদের নামে রয়েছে ১ কোটি ৭ লাখ ৩৩ হাজার ৮৫৯টি, বা ৩৬.৩৩ শতাংশ।

অর্থাৎ এই দুই শ্রেণির হিসাব মিলেই মোট নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্টের প্রায় ৭৩ শতাংশ। চরম দরিদ্রদের হিসাব ৩৫ লাখ ১০ হাজার ২৯২টি এবং তৈরি পোশাকশ্রমিকদের ১৩ লাখ ৩ হাজার ৮০১টি।

তবে হিসাব বাড়লেও সব শ্রেণিতে আমানত বাড়ছে না। জুন শেষে কৃষকদের হিসাবে জমা ছিল ৭৭৭ কোটি ৫৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ১০.৩৫ শতাংশ কম। বিপরীতে সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধাভোগীদের আমানত বেড়েছে ১০.৫৮ শতাংশ এবং এক বছরে ১৫.৪৯ শতাংশ।

তৈরি পোশাকশ্রমিকদের হিসাবও দ্রুত বাড়ছে। তিন মাসে তাঁদের হিসাব বেড়েছে ৫.৫৬ শতাংশ এবং এক বছরে ৮.৮২ শতাংশ। জুন শেষে এসব হিসাবে জমা ছিল ৫১৮ কোটি ৫০ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

কেন বাড়ছে নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্ট?

এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সরকারি উদ্যোগ। আগে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকা মানুষকে কম খরচে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় আনার জন্য নো-ফ্রিল হিসাবকে ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকারি ভাতা ও বিভিন্ন সহায়তা সরাসরি সুবিধাভোগীর হিসাবে পাঠানোর ফলে এসব হিসাব খোলার প্রয়োজনও বাড়ছে।

জুন পর্যন্ত নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সরকারের বিভিন্ন ভর্তুকি ও বেতন-ভাতা পেয়েছেন ৭১ লাখ ৮৯ হাজার ২৯১ জন। ফলে সরকারি সহায়তা পাওয়ার সঙ্গে ব্যাংক হিসাবের ব্যবহারও সরাসরি যুক্ত হয়েছে।

রেমিট্যান্স গ্রহণেও এসব হিসাব ব্যবহৃত হচ্ছে। জুন প্রান্তিক শেষে নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পুঞ্জীভূত রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৩৫ কোটি ৪২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তবে আগের প্রান্তিকের তুলনায় তা ১.১৫ শতাংশ কমেছে।

শিক্ষার্থীদের ব্যাংকিংয়েও বড় বিস্তার

আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিস্তার শুধু নিম্নআয়ের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষার্থীদের ব্যাংকিংয়ে যুক্ত করতেও নতুন গতি এসেছে। ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নতুন নির্দেশিকার পর এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নতুন করে ৭ লাখ ৮৬ হাজার ৯৪০টি স্টুডেন্ট ব্যাংকিং হিসাব খোলা হয়েছে।

জুন শেষে মোট স্টুডেন্ট ব্যাংকিং হিসাব দাঁড়িয়েছে ৭০ লাখ ৫৯ হাজার ৬১৫টি। এসব হিসাবে জমা রয়েছে ৩ হাজার ৫১৮ কোটি ৮৭ লাখ ৬০ হাজার টাকা। আগের প্রান্তিকের তুলনায় আমানত বেড়েছে ২০.৯৩ শতাংশ।

নতুন নীতিমালায় ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের স্টুডেন্ট ব্যাংকিং হিসাব খোলার সুযোগ রাখা হয়েছে। বর্তমানে ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ৫৯টি এ সেবা দিচ্ছে।

হিসাব থেকে ঋণের সুযোগ

নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্টের বিস্তারের আরেকটি কারণ হলো এসব হিসাবধারীর জন্য ঋণের সুযোগ তৈরি হওয়া। ১০, ৫০ ও ১০০ টাকার হিসাবধারীদের জন্য জামানতবিহীন পুনঃঅর্থায়ন তহবিল ৫০০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭৫০ কোটি টাকা করা হয়েছে।

এ কর্মসূচিতে গ্রাহক পর্যায়ে সুদের হার ৭ শতাংশ। একজন গ্রাহক ৫০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারেন। জুন ২০২৬ পর্যন্ত ১ লাখ ৯ হাজার ৬৯৭ জন গ্রাহককে মোট ৯৭২ কোটি ৬৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বড় ভূমিকা

নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্টে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকের আধিপত্য রয়েছে। এসব ব্যাংকের হিসাবের অংশ ৫০.২৮ শতাংশ এবং মোট আমানতের অংশ ৬১.৩৭ শতাংশ।

হিসাবের সংখ্যায় শীর্ষ পাঁচ ব্যাংক হলো সোনালী ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া ও জনতা ব্যাংক। এ পাঁচ ব্যাংকের হিসাব মিলিয়ে মোট নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্টের ৭৭.৩০ শতাংশ।

পথশিশু ও কর্মজীবী শিশুদেরও এই ব্যবস্থায় যুক্ত করা হচ্ছে। জুন শেষে ১৮টি ব্যাংক ৪৯টি এনজিওর সহযোগিতায় এ শ্রেণির শিশুদের জন্য ৪০ হাজার ৬০৭টি হিসাব খুলেছে।

সামনে বড় প্রশ্ন

নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্ট বাড়ছে—এটি আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কিন্তু শুধু হিসাব খোলার সংখ্যা দিয়ে এর সাফল্য বিচার করা যাবে না। এসব হিসাব কতটা সক্রিয়, কত ঘন ঘন লেনদেন হচ্ছে এবং গ্রাহক নিয়মিত সঞ্চয় করছেন কি না—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে সক্রিয় হিসাব পর্যবেক্ষণ, আর্থিক ও ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো এবং গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে আরও বেশি ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্ট বাড়ার গল্পটি শুধু ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা বৃদ্ধির গল্প নয়। সরকারি সহায়তা, সঞ্চয়, রেমিট্যান্স ও ঋণের সঙ্গে প্রান্তিক মানুষের সংযোগ তৈরি হওয়াই এর বড় পরিবর্তন। এখন চ্যালেঞ্জ হলো, এই হিসাবগুলোকে কতটা সক্রিয় ও কার্যকর আর্থিক সম্পর্কের মধ্যে রাখা যায়।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top