আমানত-ঋণ বাড়লেও টাকা ফেরত পাচ্ছেন না গ্রাহক

DSJ Web Photo FinancialSector
প্রতীকী ছবি (AI দ্বারা তৈরি)

আমানত বাড়ছে, ঋণও বাড়ছে—কিন্তু মেয়াদ শেষে নিজের টাকা ফেরত পাচ্ছেন না অনেক গ্রাহক। নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা এনবিএফআই খাতে এই বৈপরীত্যই এখন সবচেয়ে বড় সংকেত। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যানে গত এক বছরে খাতটির মোট আমানত বেড়েছে ৪ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং ঋণ ও অগ্রিম বেড়েছে ১ দশমিক ৯১ শতাংশ। অথচ একই সময়ে নয়, বরং দীর্ঘ মেয়াদে আমানত হিসাবের সংখ্যা কমেছে ধারাবাহিকভাবে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় ২০২৬ সালের মার্চে আমানত হিসাব কমেছে ১ লাখ ৭৫ হাজার ৩৭২টি বা ৩৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ। অর্থাৎ কাগজে-কলমে কিছু সূচকে অগ্রগতি থাকলেও গ্রাহকের আস্থার সংকট কাটেনি।

সাবেক বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) কর্মকর্তা এ কে এম আনসার উদ্দিন অবসরের সঞ্চয় থেকে ১৬ লাখ টাকা জমা রেখেছিলেন পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসে। মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তিনি মূল টাকা ফেরত পাননি, সুদ তো দূরের কথা। অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসার প্রয়োজনেও সেই অর্থ ব্যবহার করতে পারেননি তিনি। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের নভেম্বরে মারা যান আনসার উদ্দিন। তাঁর পরিবারকে আর্থিক সংকটের মধ্যেই মেয়েদের বিয়ের আয়োজন করতে হয়েছে।

একই ধরনের অনিশ্চয়তায় পড়েছেন আভিভা ফাইন্যান্সের আমানতকারী ৬৪ বছর বয়সী খলিল আহমেদ খান। চিকিৎসা ও নিয়মিত ওষুধের খরচ মেটানোর জন্য তিনি ২৩ লাখ টাকার একটি এফডিআর করেছিলেন। ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি আমানতের মেয়াদ শেষ হলেও পুরো টাকা ফেরত পাননি। দীর্ঘ সময় পর প্রতিষ্ঠানটি তাঁকে ৮ লাখ ৯৮ হাজার টাকা ফেরত দিয়েছে। বাকি অর্থ কবে পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছ থেকেও তিনি নিশ্চিত সময়সূচি পাননি। ফলে চিকিৎসা ও অন্যান্য জরুরি ব্যয় মেটানো নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তিনি।

আনসার উদ্দিন ও খলিল আহমেদের অভিজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। দেশের নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বহু আমানতকারী এখন অর্থ ফেরতের অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের তারল্য সংকট, উচ্চ খেলাপি ঋণ, অনিয়ম ও ঋণ জালিয়াতির কারণে পুরো খাতের ওপরই আস্থার চাপ তৈরি হয়েছে। তবে খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান একই অবস্থায় নেই; কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এখনো তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান সেবা দিচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় ২০টি প্রতিষ্ঠান নাজুক অবস্থায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। সংকটাপন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পাঁচটির অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর অংশ হিসেবে এসব প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সংকটে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তায় সরকারের পক্ষ থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

গ্রাহকের আস্থার সংকটের মধ্যেও ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এনবিএফআই খাতে আমানত বেড়েছে ২ হাজার ৭০ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে খাতটির মোট আমানত ছিল ৪৯ হাজার ৪৮৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ৫৫৮ কোটি ৮১ লাখ টাকায়। ফলে এক বছরে আমানত বেড়েছে ৪ দশমিক ১৯ শতাংশ।

তবে আমানত বাড়ার এই পরিসংখ্যানকে গ্রাহকের আস্থা ফেরার সরাসরি প্রমাণ হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। কারণ একই সময়ে আমানত হিসাবের সংখ্যা নয়, বরং দীর্ঘ মেয়াদে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে আমানত হিসাব ছিল ৫ লাখ ২২ হাজার। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তা কমে দাঁড়ায় ৪ লাখ ৩১ হাজারে। আর ২০২৬ সালের মার্চে আমানত হিসাব আরও কমে হয়েছে ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৬২৮টি।

অর্থাৎ ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের মার্চ—প্রায় সাড়ে তিন বছরের ব্যবধানে আমানত হিসাব কমেছে ১ লাখ ৭৫ হাজার ৩৭২টি। শতাংশের হিসাবে এই পতন ৩৩ দশমিক ৫৯ শতাংশ। অর্থাৎ হিসাবের সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশের বেশি কমে গেলেও মোট আমানত বেড়েছে। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এর একটি কারণ হতে পারে বিদ্যমান আমানতের ওপর নিয়মিত সুদ যুক্ত হয়ে মোট আমানতের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। ফলে আমানতের মোট অঙ্ক বাড়লেও নতুন গ্রাহক যুক্ত হওয়া বা আমানতকারীর আস্থা ফেরার চিত্র একইভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না।

এনবিএফআই খাতে ঋণ ও অগ্রিমের প্রবৃদ্ধিও খুবই সীমিত। ২০২৫ সালের মার্চে প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট ঋণ ও অগ্রিম ছিল ৭৬ হাজার ৯৫৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৮ হাজার ৪২৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকায়। অর্থাৎ এক বছরে ঋণ ও অগ্রিম বেড়েছে ১ হাজার ৪৬৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা বা ১ দশমিক ৯১ শতাংশ।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, তারল্য সংকট, খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যাওয়া এবং গ্রাহকের আস্থাহীনতা—সব মিলিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক ব্যবসা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে একদিকে পুরোনো আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার চাপ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন আমানত সংগ্রহ ও ঋণ বিতরণ—দুই ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।

এনবিএফআই খাতের বর্তমান সংকটের পেছনে ঋণ জালিয়াতি ও নানা অনিয়মেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ২০১৫ সাল থেকে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচালকরা নিয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।

এসব অনিয়মের কারণে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়ে এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ আমানতকারীরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সামনে বিক্ষোভ ও সভা-সমাবেশ করেন। এতে শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নয়, পুরো এনবিএফআই খাতের ওপর মানুষের আস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগে।

আইডিএলসি ফাইন্যান্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ খান বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা সমাধানে খেলাপি ঋণ আদায়, সুশাসন নিশ্চিত করা, মূলধন শক্তিশালী করা এবং দুর্বল প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের ওপর জোর দিতে হবে। আমানতকারীদের স্বার্থে কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঝুঁকিভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে হবে।

তিনি বলেন, সাময়িক তারল্য সহায়তার পাশাপাশি যেসব প্রতিষ্ঠান টেকসই নয়, সেগুলোকে একীভূত বা সুশৃঙ্খলভাবে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু তারল্য সহায়তা দিয়ে এনবিএফআই খাতের দীর্ঘদিনের সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। খেলাপি ঋণ আদায়, ঋণ অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, পরিচালনা পর্ষদে সুশাসন, মূলধন ঘাটতি পূরণ এবং দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্রুত পুনর্গঠন জরুরি। একই সঙ্গে আমানতকারীর অর্থ ফেরতের বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থা তৈরি করতে না পারলে নতুন করে গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top