একই ঘটনা, একই বিভাগীয় তদন্ত, একই সময়ের অভিযোগ। কিন্তু শাস্তির ফল একেবারেই ভিন্ন। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ২২ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে ১৭ জনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। আর পাঁচজনকে লঘুদণ্ড দিয়ে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়েছে। প্রত্যাহার করা হয়েছে তাদের সাময়িক বরখাস্তের আদেশও।
বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবুল কালাম সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো কর্মকর্তারা হলেন নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল করিম, পরিচালক মোহাম্মদ আবুল হাসান, আবু রায়হান মোহাম্মদ মুতাসীম বিল্লাহ ও মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম মজুমদার, অতিরিক্ত পরিচালক নজরুল ইসলাম ও মোল্যা মো. মিরাজ উস সুন্নাহ, যুগ্ম পরিচালক রাশেদুল আলম, উপপরিচালক মো. নান্নু ভূঞা, কাজী মো. আল-ইসলাম, শহিদুল ইসলাম, বনী ইয়ামিন খান ও তৌহিদ হাসান, সহকারী পরিচালক আমিনুল হক খান, আবদুল বাতেন ও সাজ্জাদ হোসেন এবং ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আবু ইউসুফ, কাওসার পাশা ও সমীর ঘোষ।
অন্যদিকে বেতন স্কেল নিম্নস্তরে অবনমিত করার লঘুদণ্ড দিয়ে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়েছে সহকারী পরিচালক জনি হোসেন, রায়হান কবির, তরিকুল ইসলাম, মাকসুদ মিলা ও লাইব্রেরিয়ান সেলিম রেজা বাপ্পীকে।
শাস্তির এই বড় পার্থক্য নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে—একই ঘটনার দায় নির্ধারণে ২২ কর্মকর্তার ক্ষেত্রে কি একই মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে? বিশেষ করে পাঁচজনকে সামাজিক ও মানবিক পরিস্থিতি বিবেচনায় চাকরিতে ফেরানো হলেও একই ধরনের পরিস্থিতিতে থাকা অন্যদের কেন সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া কর্মকর্তারা।
বিএসইসি বলছে, পাঁচজনের বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হলেও তাদের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা এবং প্রায় চার বছরের চাকরির মেয়াদ বিবেচনায় শাস্তি কমানো হয়েছে। অন্যদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকায় একই সুবিধা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
গত মঙ্গলবার রাতে বর্তমান বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান ডিএসজেকে বলেন, “পুরো বিষয়টি আমাদের জন্য অস্বস্তিকর। কারণ ঘটনার সময় বর্তমান কমিশনের কেউ ছিলেন না। এ বিষয়টি আগের কমিশনেরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। আমাদেরকে প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।”
সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিষয়টি আরও যাচাই করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “তারপরও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের কাছে পাঠানো হয়েছিল। উনার সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”
শাস্তির ধরন নিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, “আমরা কাউকে বরখাস্ত করিনি, বরং মানবিক বিবেচনায় অবসরে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া সামাজিক, মানবিক বিবেচনায় পাঁচজনকে লঘুদণ্ড দিয়ে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়েছে। অন্যদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকায় এমন সুযোগ দেওয়া যায়নি।”
পুনর্বহাল করা পাঁচ কর্মকর্তাকে দেওয়া কমিশনের চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ৫ ও ৬ মার্চের বিভিন্ন অননুমোদিত সভা, বোর্ডরুমে প্রবেশ, সংবাদ সম্মেলন ও কর্মবিরতিতে তারা দলবদ্ধভাবে অংশ নিয়েছিলেন। তদন্ত বোর্ডের প্রতিবেদনে তাদের বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
তবে তাদের কর্মকাণ্ডের গুরুত্ব, আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা এবং প্রায় চার বছরের চাকরির মেয়াদ বিবেচনায় কমিশন নমনীয় অবস্থান নেয়। ১৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত ১ হাজার ২৫তম কমিশন সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তাদের বরখাস্ত না করে ‘বেতন স্কেল নিম্নস্তরে অবনমিতকরণ’ নামের লঘুদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে তাদের চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয়।
এখানেই শাস্তির সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, একই ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকা কয়েকজনের চাকরির মেয়াদও প্রায় চার বছর। তারাও মানবিক বিবেচনায় পুনর্বহালের আবেদন করেছিলেন। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে লঘুদণ্ডের পরিবর্তে বাধ্যতামূলক অবসরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তাদের প্রশ্ন, পাঁচজনের ক্ষেত্রে যদি চাকরির মেয়াদ, আর্থিক অবস্থা ও সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শাস্তি কমানো যায়, তাহলে একই ধরনের পরিস্থিতিতে থাকা অন্যদের ক্ষেত্রে সেই বিবেচনা কেন করা হলো না। পাশাপাশি ২২ কর্মকর্তার প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ভূমিকা ও দায় কীভাবে আলাদা করে নির্ধারণ করা হয়েছে, সে প্রশ্নও তুলেছেন তারা।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালের ৫ মার্চ। ওই দিন কোনো নির্দিষ্ট কারণ না দেখিয়ে ‘জনস্বার্থে’ তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক মো. সাইফুর রহমানকে চাকরি থেকে অবসর দেয় তৎকালীন চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন কমিশন।
সাইফুর রহমানকে অবসরে পাঠানোর প্রতিবাদে পরদিন বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী কমিশন সভায় অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করেন। একপর্যায়ে চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা বোর্ডরুমে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন।
তৎকালীন চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের অভিযোগ ছিল, তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করা হয়, অশ্লীল স্লোগান দেওয়া হয় এবং পদত্যাগের দাবি জানানো হয়। রিমোট ছোড়া, বোর্ডরুমের লাইট ও বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া এবং বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের প্রায় চার ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগও করা হয়।
পরে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় তারা বেরিয়ে আসেন। ৬ মার্চ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কর্মবিরতি ও সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে সাইফুর রহমানের অবসর এবং কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশের বিরোধিতা করা হয়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওই সংবাদ সম্মেলনেও বিএসইসির দুই শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন।
এই দুই দিনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ২৩ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগনামা গঠন করা হয় এবং একই দিনে ২১ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে আরও দুজনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে একজন অভিযুক্তকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হলে তাকে বিভাগীয় মামলা থেকে বাদ দেওয়া হয়। ফলে শেষ পর্যন্ত ২২ জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে।
সাময়িক বরখাস্তের মেয়াদ ছয় মাস হওয়ার কথা থাকলেও অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের অনেকে প্রায় ১৬ মাস এ অবস্থায় ছিলেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এ সময়ে তারা খোরপোষ বাবদ সীমিত অর্থ পেয়েছেন বলেও তাদের দাবি।
বিভাগীয় মামলাগুলোর তদন্তের জন্য ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন তৎকালীন বিএসইসি চেয়ারম্যান। পরে ২৮ সেপ্টেম্বর একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
তদন্ত কমিটি অভিযুক্তদের লিখিত বক্তব্য ও শুনানি পর্যালোচনা করে। এরপর দুই দফায় ৫৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য পর্যালোচনা করা হয়।
এই সাক্ষ্যগুলোর বিশ্লেষণে একটি বিষয় স্পষ্ট—সব অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তিনির্দিষ্ট সাক্ষ্য নেই, এমন দাবি করা যাবে না। আবার ৫৩ সাক্ষ্যের সবগুলোতেই প্রত্যেক অভিযুক্তের নির্দিষ্ট অপরাধের প্রত্যক্ষ বর্ণনা রয়েছে—তাও নয়।
একজন কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করার ঘটনায়, বোর্ডরুমে রিমোট ছোড়ার ঘটনায় এবং গেট বন্ধ করার ঘটনায় তিনজনের সম্পৃক্ততার কথা সাক্ষ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে তৎকালীন চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা ছাড়া অন্য সাধারণ সাক্ষীদের বক্তব্য ছিল ৫ মার্চের কমিশন সভা, ৬ মার্চের সংবাদ সম্মেলন, কর্মবিরতি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উপস্থিতি এবং ঘটনাকালীন সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে। ভাংচুর, সিসি ক্যামেরা নষ্ট করা বা কাউকে আক্রমণের মতো নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ড নিজের চোখে দেখেছেন—এমন ব্যক্তিনির্দিষ্ট বর্ণনা সব সাক্ষ্যে পাওয়া যায়নি।
ফলে মূল প্রশ্নটি দাঁড়াচ্ছে—কে শুধু ঘটনাস্থলে বা কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন আর কে নির্দিষ্ট শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন, তদন্তে এই পার্থক্য কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সেই পার্থক্য শাস্তির মাত্রা নির্ধারণে কতটা প্রভাব ফেলেছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিএসইসির একাধিক কর্মকর্তা।
এমন সিদ্ধান্তে বিএসইসির কর্মকর্তারাও চরম হতাশ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, খন্দকার রাশেদ মাকসুদের কমিশন বিএসইসিকে এমন একটি অবস্থানে রেখে গেছে, যেখানে কর্মকর্তারা এখন চাকরির অবশিষ্ট সময়টুকু মানসম্মানের সঙ্গে পার করাকেই বড় সৌভাগ্য বলে মনে করছেন।
বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের দাবি, ৫ মার্চের কমিশন সভায় দুই শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন। শুধু উপস্থিতি বা দলবদ্ধভাবে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়াই যদি শাস্তির ভিত্তি হয়, তাহলে তাদের মধ্য থেকে ২২ জনকে কীভাবে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হলো—সেটিই তাদের প্রশ্ন।
শাস্তির সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত দায় প্রধান বিবেচনা হয়ে থাকলে প্রত্যেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোন সাক্ষ্য, কোন ঘটনা এবং কোন ভূমিকা বিবেচনা করা হয়েছে—সেটি নিয়েও তাদের প্রশ্ন রয়েছে।
বাধ্যতামূলক অবসরের আর্থিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, যাদের চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে, তারা অবসরসংক্রান্ত পূর্ণ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এমন কর্মকর্তা রয়েছেন চারজন। ১২ থেকে ২৩ বছর চাকরি করা কর্মকর্তারা কিছু আর্থিক সুবিধা পেলেও গৃহঋণসহ অন্যান্য দায় পরিশোধে সেই অর্থের বড় অংশ চলে যেতে পারে।
অন্যদিকে চার বছরের সামান্য বেশি চাকরি করা কর্মকর্তারা বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়ায় আর্থিকভাবে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়বেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। কারও গৃহঋণ থাকলে বাধ্যতামূলক অবসরের কারণে তা পরিশোধের সক্ষমতাও কমে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে বিএসইসির এই সিদ্ধান্তে তিনটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—প্রত্যেক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত দায় কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, সাক্ষ্য-প্রমাণের মাত্রা শাস্তির পার্থক্য তৈরিতে কীভাবে কাজ করেছে এবং একই ধরনের চাকরির মেয়াদ ও সামাজিক পরিস্থিতিতে থাকা কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে মানবিক বিবেচনার মানদণ্ড অভিন্ন ছিল কি না।
ফলে বিষয়টি এখন শুধু ২২ কর্মকর্তার চাকরি ও আর্থিক ভবিষ্যতের প্রশ্ন নয়; বিএসইসির মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থায় বিভাগীয় শাস্তির ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত দায়, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং শাস্তির সামঞ্জস্য—এই তিনটি মানদণ্ড কীভাবে প্রয়োগ করা হয়, সেটিও হয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন।













