গ্রামীণ সড়ক পুনর্বাসনে ৪,৯৬৪ কোটি টাকা, রাবার-বিটুমিনের পরীক্ষা

DSJ Web Photo RuralRoads
ছবি- ইআরডি

সড়ক বানানোর পর পড়ে থাকবে না অবহেলায়। পুরোনো সড়ক টেকসই করতে এবার রক্ষণাবেক্ষণেও জোর দিচ্ছে সরকার। প্রথমবারের মতো ১০০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়কে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হবে রাবার-বিটুমিন। ফল ভালো হলে বাড়বে এর ব্যবহার। একই সঙ্গে ৫ হাজার ২২৩ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ সড়ক পুনর্বাসনে ব্যয় হবে প্রায় ৪ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা।

বুধবার (১৯ আগস্ট) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ‘গ্রামীণ সড়ক পুনর্বাসন ও শক্তিশালীকরণ’সহ মোট ১০টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ হাজার ৩৩৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৮ হাজার ৪৮৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা। বাকি ৮৪৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা প্রকল্প ঋণ থেকে জোগান দেওয়ার কথা রয়েছে। অনুমোদিত প্রকল্পের মধ্যে ছয়টি নতুন এবং চারটি সংশোধিত।

শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এসব প্রকল্প অনুমোদন করা হয়।

অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় বরাদ্দ রয়েছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের ‘গ্রামীণ সড়ক পুনর্বাসন ও শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্পে। এতে ব্যয় হবে ৪ হাজার ৯৬৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। পুরো অর্থই সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হবে। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় ৫ হাজার ২২৩ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক এবং ৭ হাজার মিটার সেতু ও কালভার্ট পুনর্বাসন করা হবে। নতুন সড়ক নির্মাণের বদলে মানুষের চলাচলে দুর্ভোগ তৈরি করা ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যমান সড়কগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পুনর্বাসন ও শক্তিশালী করা হবে।

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের আওতায় সারা দেশে পল্লি এলাকায় বিভিন্ন শ্রেণির মোট ৪ লাখ ১০ হাজার ৫৩০ দশমিক ৯৪ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে পাকা গ্রামীণ সড়ক ৯৮ হাজার ২৩২ দশমিক ২৭ কিলোমিটার। এসব পাকা সড়কের মধ্যে ৩১ হাজার ৪৩৪ দশমিক ৩২ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত। যাচাই-বাছাই করে এর মধ্য থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ৫ হাজার ২২৩ কিলোমিটার সড়ক পুনর্বাসনের জন্য নেওয়া হয়েছে।

সরকারের হিসাবে, এসব সড়ক পুনর্বাসনের ফলে গ্রামীণ এলাকার নিরাপদ যোগাযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে কৃষি ও অকৃষিপণ্য বাজারজাতের সময় ও পরিবহন ব্যয় কমবে। এতে কৃষিপণ্য দ্রুত বাজারে পৌঁছানো এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার সুযোগ তৈরি হবে।

একনেক সভায় শুধু সড়ক সংস্কার নয়, সংস্কারের পর রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, মেরামতের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না হলে সড়ক দ্রুত আবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই সড়ক নির্মাণ ও পুনর্বাসনের পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ও নজরদারি জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ছোট সেতু ও কালভার্টের রক্ষণাবেক্ষণেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

গ্রামীণ সড়কের স্থায়িত্ব বাড়াতে রাবার-বিটুমিন ব্যবহারের নির্দেশনাও এসেছে। প্রথম বছর ১০০ কিলোমিটার সড়কে পরীক্ষামূলকভাবে এই উপকরণ ব্যবহার করা হবে। পরে এর কার্যকারিতা ও স্থায়িত্ব মূল্যায়ন করা হবে। ফল সন্তোষজনক হলে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য গ্রামীণ সড়কেও প্রযুক্তিটি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এর উদ্দেশ্য ঘন ঘন সংস্কারের প্রয়োজন কমিয়ে সড়কের স্থায়িত্ব বাড়ানো।

এদিকে সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেন, মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে বয়লার বা কারিগরি ত্রুটির কারণে গ্যাস সরবরাহে সমস্যা তৈরি হয়েছিল। তবে সেটি সমাধান হয়েছে এবং পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। সংকট মোকাবিলায় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।

একনেকে অনুমোদিত অন্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্প রয়েছে। এর একটি ঢাকা মেডিকেল কলেজের ব্যবহার অনুপযোগী স্থাপনা প্রতিস্থাপন ও পুনর্নির্মাণ। অন্যটি ১১টি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য ২১টি আধুনিক হোস্টেল ভবন নির্মাণ।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের ‘সেতুর স্মার্ট রক্ষণাবেক্ষণ প্রযুক্তির সক্ষমতা উন্নয়ন’ প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে। এর মাধ্যমে সেতুর টেকসই রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রকল্পটির আওতায় যমুনা সেতু, পদ্মা সেতু ও কর্ণফুলী টানেলের মতো বড় অবকাঠামো যুক্ত করা যায় কি না, তা ঋণদাতা সংস্থা ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে। এর একটি ধরলা নদীর ডান তীরের ভাঙন থেকে লালমনিরহাট সদর উপজেলা রক্ষা। অন্যটি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট থেকে কুমিরা ঘাট পর্যন্ত উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালীকরণ। বাঁশবাড়িয়া প্রকল্পে আপাতত শুধু ঘাট অংশের কাজ এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বাঁধ নির্মাণের আগে জমি অধিগ্রহণ ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ করতে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সক্ষমতা জোরদারকরণ, জামালপুরের মাদারগঞ্জে ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, ঢাকায় ডেসকো এলাকার বৈদ্যুতিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং রামু সেনানিবাসের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।

মাদারগঞ্জের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় সংশোধন করা হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রকল্প পরিচালক ও ঠিকাদারদের অনেকে অনুপস্থিত হয়ে যাওয়ায় কাজ ব্যাহত হয়। প্রকল্পে সম্ভাব্য অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়েও তদন্ত হয়েছে। এখন প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করা।

তবে একনেকে দুটি প্রকল্প অনুমোদন না দিয়ে সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে দুটি ওয়েল ট্যাংকার ক্রয় প্রকল্পটি চীন সফরের সময় চারটি ট্যাংকার কেনার সমঝোতার সঙ্গে সমন্বয় করে পুনরায় উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর ‘মেট্রো ঢাকা’ প্রকল্পের ক্ষেত্রে রাজধানীকে ঘিরে চলমান প্রায় ১১টি প্রকল্প সমন্বয় করে একটি সমন্বিত প্রকল্প নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রামু সেনানিবাসের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের সময় পরিবেশগত বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাহাড় কেটে সমতল করে কোনো অবকাঠামো নির্মাণ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বাঁধকে টেকসই করতে দুই পাশে ‘বিন্না’ ঘাস লাগানোর বিষয়টি প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে এবারের একনেকের সিদ্ধান্তে শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ নয়, পুরোনো অবকাঠামোর স্থায়িত্ব ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ সড়কে রাবার-বিটুমিনের পরীক্ষামূলক ব্যবহার সফল হলে দেশের বিপুলসংখ্যক গ্রামীণ সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থায় এর বড় প্রভাব পড়তে পারে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

More News

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top