একদিকে গ্রামের মানুষ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে টাকা জমাচ্ছেন, অন্যদিকে বিদেশ থেকে আসা রেমিট্যান্সের বড় অংশও পৌঁছাচ্ছে তাদের হাতে। কিন্তু একই গতিতে গ্রামীণ এলাকায় ঋণ যাচ্ছে না। জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিতরণ হওয়া রেমিট্যান্সের ৯০ দশমিক ৪৪ শতাংশ গেছে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে, যেখানে মোট ঋণের ৬৪ দশমিক ১৭ শতাংশ গেছে গ্রামে। ফলে ব্যাংকিং সেবা বিস্তারে গ্রাম এগিয়ে থাকলেও ঋণপ্রবাহে তৈরি হয়েছে বড় ব্যবধান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এপ্রিল-জুন ২০২৬ প্রান্তিকের এজেন্ট ব্যাংকিংবিষয়ক ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩০ জুন পর্যন্ত ৩০টি ব্যাংক ১৫ হাজার ৪২৪ জন এজেন্টের মাধ্যমে ২০ হাজার ৫৯৭টি আউটলেটে সেবা দিয়েছে। মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় এজেন্টের সংখ্যা ১ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং আউটলেট ১ দশমিক ২৭ শতাংশ বেড়েছে। মোট এজেন্টের ৮৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ এবং আউটলেটের ৮৫ দশমিক ৪৫ শতাংশই রয়েছে গ্রামীণ এলাকায়।
জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৭২ লাখ ২৪ হাজার ২৫৬টি। এর মধ্যে গ্রামীণ এলাকার অ্যাকাউন্ট ২ কোটি ৩০ লাখ ২৭ হাজার ৭৫৫টি, অর্থাৎ প্রায় ৮৫ শতাংশ। নারী গ্রাহকদের অ্যাকাউন্ট রয়েছে ১ কোটি ৩৫ লাখ ৫৮ হাজার ৯১৮টি। মার্চের তুলনায় মোট অ্যাকাউন্ট বেড়েছে ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সংগৃহীত আমানতও বেড়েছে। জুন শেষে মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ৯০৭ কোটি ২৯ লাখ টাকা। তিন মাসে তা বেড়েছে ১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। এর মধ্যে গ্রামীণ এলাকায় জমা হয়েছে ৪২ হাজার ২৫১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, যা মোট আমানতের ৮১ দশমিক ৪০ শতাংশ।
ঋণ বিতরণে প্রবৃদ্ধি আরও বেশি। জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৮৭০ কোটি ৪০ লাখ টাকা, যা মার্চের তুলনায় ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ বেশি। তবে এর ৬৪ দশমিক ১৭ শতাংশ গেছে গ্রামীণ এলাকায়। নারী গ্রাহকদের অংশ আরও কম—মোট ঋণের মাত্র ১২ দশমিক ৭২ শতাংশ।
অন্যদিকে আমানতের বিপরীতে ঋণের অনুপাত জুনে বেড়ে ৭৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ হয়েছে, যা মার্চে ছিল ৭৪ দশমিক ১৬ শতাংশ। গ্রামীণ এলাকায় এই অনুপাত ৬২ শতাংশ, আগের প্রান্তিকে যা ছিল ৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ গ্রামে ঋণপ্রবাহ বাড়লেও আমানতের তুলনায় তা এখনো শহরের তুলনায় কম।
রেমিট্যান্সে অবশ্য পুরো চিত্র উল্টো। জুন শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বিতরণ করা অন্তর্মুখী রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৪ হাজার ৯০৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৩৬০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা গেছে গ্রামীণ এলাকায়। ফলে মোট রেমিট্যান্সের ৯০ দশমিক ৪৪ শতাংশই পেয়েছে গ্রামের মানুষ।
ব্যাংকভিত্তিক হিসাবে আউটলেট ও অ্যাকাউন্টে শীর্ষে রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। আমানত সংগ্রহে শীর্ষে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। আর ঋণ বিতরণে বড় ব্যবধানে এগিয়ে ব্র্যাক ব্যাংক। ব্যাংকটির এজেন্ট ব্যাংকিং ঋণ বিতরণ ৩০ হাজার ১৫৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৭৩ দশমিক ৭৯ শতাংশ। রেমিট্যান্স বিতরণেও শীর্ষে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, যার মাধ্যমে এসেছে মোট রেমিট্যান্সের ৫৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
নারী উদ্যোক্তাদের পরিচালিত এজেন্ট আউটলেটের সংখ্যাও বেড়েছে। জুন শেষে ২৮টি ব্যাংকের ১ হাজার ৭৭৬টি নারী মালিকানাধীন এজেন্ট পয়েন্টের আওতায় ছিল ২ হাজার ১০৬টি আউটলেট। এসব আউটলেটে অ্যাকাউন্ট রয়েছে ২৩ লাখ ৩৯ হাজার ৫৪৪টি।
সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে এজেন্ট ব্যাংকিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে গ্রামীণ এলাকায় আমানতের তুলনায় ঋণপ্রাপ্তি কম এবং নারী উদ্যোক্তাদের ঋণের অংশও সীমিত। তাই গ্রামীণ নারী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রবাহ বাড়াতে ব্যাংকগুলোর আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।













