গ্যাস নেই, বিদ্যুৎও অনিয়মিত—জ্বালানি সংকটে চাপে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প। উৎপাদন সচল রাখতে যেখানে কারখানাগুলো প্রতিনিয়ত জ্বালানির নিশ্চয়তা খুঁজছে, সেখানেই বড় সম্ভাবনা হয়ে উঠতে পারে কারখানার ছাদ। দেশের পোশাক কারখানাগুলোর প্রায় ৯৭ লাখ বর্গমিটার ছাদ কাজে লাগিয়ে ১ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব বলে জানিয়েছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির হিসাবে, এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ১৮৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ ‘তৈরি পোশাক খাতে শিল্প কারখানায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ: চীনা প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগের সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনায় এ তথ্য তুলে ধরে সিপিডি।
সংস্থাটি জানায়, দেশের ৩ হাজার ৩২০টি পোশাক কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০০টি কারখানা তাৎক্ষণিকভাবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত। ঢাকায় ১৭৬টি এবং গাজীপুরে ১৭৩টি কারখানা দ্রুত এ উদ্যোগ নিতে পারে। নীতিগত ও অন্যান্য সহায়তা পাওয়া গেলে আরও প্রায় ১ হাজার ৩০০ কারখানায় সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন সম্ভব হবে। তবে প্রায় ৪৩০ থেকে ৪৪০টি কারখানায় বড় ধরনের হস্তক্ষেপ ও সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
সিপিডির মতে, প্রাথমিকভাবে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরকে অগ্রাধিকার দিয়ে এ উদ্যোগ শুরু করা যেতে পারে। এসব এলাকায় বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত কারখানার সংখ্যা বেশি এবং তৈরি পোশাক শিল্পের বড় অংশের কারখানাও এখানে অবস্থিত।
আলোচনায় বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী স্বপন বণিক বলেন, বাংলাদেশের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস হতে পারে সৌরবিদ্যুৎ। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে বর্ষায় সর্বোচ্চ প্রায় ২২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেলেও শুষ্ক মৌসুমে উৎপাদন ৮০ থেকে ১০০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে আসে। বায়ুবিদ্যুৎ থেকেও নিয়মিত পর্যাপ্ত উৎপাদন পাওয়া যায় না।
তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ দিনের বেলায় পাওয়া যায়। শিল্পকারখানায় দিনের বেলায় এর ব্যবহার বাড়ানো গেলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুতের গড় ব্যয়ও কমানো সম্ভব।
বিকেএমইএর পরিচালক মিনহাজুল হক বলেন, তৈরি পোশাক খাতের চলমান তীব্র গ্যাস ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের একটি পথ। তবে শিল্প সচল রাখতে এখনই স্বল্পমেয়াদি সমাধানও প্রয়োজন। বিশেষ করে নিটিং, ডাইং ও ওয়াশিংয়ের মতো পশ্চাৎমুখী শিল্প সচল না থাকলে পোশাক কারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হবে।
তিনি বলেন, নিয়মিত ও উচ্চহারে গ্যাস-বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করে আসা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক সংকটের কারণে সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করার বিষয়ে সরকারি নির্দেশনা প্রয়োজন।
বিডার পরিচালক নুসরাত জাহান বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ সহজ করতে নীতিগত সহায়তা, কর সুবিধা, গ্রিন ফাইন্যান্স ও এসএমই অর্থায়ন সহজ করার প্রস্তাবগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। চীনা বিনিয়োগকারীদেরও প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও সহায়তা দেবে বিডা।
তিনি বলেন, বিনিয়োগকারীদের অন্যতম প্রধান প্রশ্ন হলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ। কারখানা স্থাপনের পর প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ না পেলে বিনিয়োগের সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। তাই শিল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহের স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করতে হবে।
সিপিডির এই গবেষণা বলছে, পোশাক খাতের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ শুধু জ্বালানি সংকট মোকাবিলার বিকল্প নয়; একই সঙ্গে এটি শিল্পের উৎপাদন ব্যয় কমানো, পরিবেশগত চাপ হ্রাস এবং সবুজ বিনিয়োগ আকর্ষণের একটি বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।











