নতুন কর্পোরেট গভর্ন্যান্স বিধিমালার মাধ্যমে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও বিনিয়োগবান্ধব করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান মাসুদ খান। তাঁর মতে, ‘কর্পোরেট গভর্ন্যান্স রুলস, ২০২৬’ কার্যকর হলে শুধু নিয়ন্ত্রক কাঠামোই শক্তিশালী হবে না, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির পাশাপাশি তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোতে সুশাসনের সংস্কৃতিও আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।
শনিবার (২৫ জুলাই) ঢাকার বিআইএম অডিটোরিয়ামে ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশ (আইসিএসবি) আয়োজিত ‘প্রস্তাবিত বিএসইসি কর্পোরেট গভর্ন্যান্স রুলস, ২০২৬’ শীর্ষক কন্টিনিউয়িং প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট (সিপিডি) কর্মসূচিতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মাসুদ খান বলেন, পুঁজিবাজারে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে শুধু ভালো কোম্পানি থাকলেই হবে না; প্রয়োজন কার্যকর কর্পোরেট গভর্ন্যান্স। নতুন বিধিমালার মাধ্যমে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর পরিচালনা পর্ষদ, অডিট কমিটি, স্বতন্ত্র পরিচালক ও কোম্পানি সেক্রেটারিদের দায়িত্ব আরও স্পষ্ট ও জবাবদিহিমূলক হবে। এতে নিয়ন্ত্রক তদারকি যেমন শক্তিশালী হবে, তেমনি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষাও আরও কার্যকর হবে।
তিনি বলেন, নতুন বিধিমালার সফল বাস্তবায়নে গভর্ন্যান্স পেশাজীবীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইন প্রণয়ন করাই শেষ কথা নয়; সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমেই এর সুফল নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানিজের (বিএপিএলসি) সভাপতি রিয়াদ মাহমুদ বলেন, নতুন কর্পোরেট গভর্ন্যান্স বিধিমালা কার্যকর করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, তালিকাভুক্ত কোম্পানি এবং গভর্ন্যান্স পেশাজীবীদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় প্রয়োজন। কর্পোরেট খাতকে আরও শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক করতে অংশীজনদের যৌথ উদ্যোগের বিকল্প নেই।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইসিএসবির সাবেক সভাপতি ও মোহাম্মদ সানাউল্লাহ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সানাউল্লাহ। তিনি প্রস্তাবিত বিধিমালার বিভিন্ন নতুন সংযোজন ও পরিবর্তনের বিশদ বিশ্লেষণ তুলে ধরে বলেন, নতুন কাঠামো আন্তর্জাতিক কর্পোরেট গভর্ন্যান্স মানদণ্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোকে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করবে।
তিনি জানান, প্রস্তাবিত বিধিমালায় পরিচালনা পর্ষদের কার্যকারিতা বৃদ্ধি, অডিট কমিটির জবাবদিহি শক্তিশালী করা, স্বতন্ত্র পরিচালকদের ভূমিকা বাড়ানো এবং কোম্পানি সেক্রেটারিদের দায়িত্বের পরিধি সম্প্রসারণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক রেগুলেটরি প্রত্যাশা ও সর্বোত্তম চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর্পোরেট সুশাসন বাস্তবায়নের দিকনির্দেশনাও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন ওয়ালটনের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও কোম্পানি সেক্রেটারি মো. রফিকুল ইসলাম, ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসির কোম্পানি সেক্রেটারি মাহবুবুর রহমান এবং ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) কর্পোরেট গভর্ন্যান্স অফিসার লোপা রহমান।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, নতুন বিধিমালার সফল বাস্তবায়নে শুধু আইন নয়, প্রয়োজন কর্পোরেট সংস্কৃতির পরিবর্তন। ভোক্তা ও বিনিয়োগকারীর আস্থা ধরে রাখতে স্বচ্ছতা, নৈতিকতা, তথ্য প্রকাশ এবং জবাবদিহিকে প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রমের অংশে পরিণত করতে হবে। একই সঙ্গে কোম্পানি সেক্রেটারিদের ভূমিকা ভবিষ্যতে আরও কৌশলগত হয়ে উঠবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইসিএসবির সভাপতি হোসাইন সাদাত। তিনি বলেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল নিয়ন্ত্রক পরিবেশে গভর্ন্যান্স পেশাজীবীদের দক্ষতা উন্নয়নে আইসিএসবি ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এ ধরনের সিপিডি কর্মসূচির মাধ্যমে সদস্যদের আন্তর্জাতিক মানের জ্ঞান ও সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশগ্রহণকারীরা প্রস্তাবিত বিধিমালার বাস্তব প্রয়োগ, সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ এবং কর্পোরেট কমপ্লায়েন্স সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করেন।
অনুষ্ঠানে চার্টার্ড সেক্রেটারি, কোম্পানি পরিচালক, কর্পোরেট নির্বাহী, গভর্ন্যান্স বিশেষজ্ঞ, নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর্মকর্তারা অংশ নেন। বক্তারা অভিমত দেন, শক্তিশালী কর্পোরেট গভর্ন্যান্স কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা গেলে তা শুধু পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতাই বাড়াবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।













