সাধারণ মানুষের টাকায় ব্যাংক, বড় খেলাপিদের দখলে ঋণ

DSJ Web Photo July 23 2026 FinancialStability
ডিএসজে

ব্যাংকে আস্থা রেখে সাধারণ মানুষ এক বছরে আরও প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা জমা রেখেছেন। এতে দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট আমানত বেড়ে ২১ লাখ ৫৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। কিন্তু সেই অর্থের বড় অংশই এখন আটকে আছে বড় করপোরেট গ্রুপ ও ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের ঋণে। ফলে আমানত বাড়লেও ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের হার এক বছরে ২৪.৬ শতাংশ থেকে লাফিয়ে রেকর্ড ৩২.৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য নতুন করে বড় সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগের ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট: মার্চ ২০২৬’ শীর্ষক সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ব্যাংকিং খাতের এই দ্বিমুখী চিত্র। একদিকে আমানতকারীদের আস্থা অটুট থাকলেও অন্যদিকে লাগামহীন খেলাপি ঋণ পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ১৯ লাখ ২৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৫৮ হাজার কোটি টাকায়। মোট আমানতের ৮৩ শতাংশ এসেছে বেসরকারি খাত থেকে এবং এর সবচেয়ে বড় অংশই সাধারণ গৃহস্থালি বা ব্যক্তিশ্রেণীর সঞ্চয়। ব্যক্তিশ্রেণীর আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অবশিষ্ট ১৭ শতাংশ এসেছে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বড় অঙ্কের আমানতের তুলনায় ছোট ও মাঝারি সঞ্চয় হিসাবেই সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। দুই লাখ টাকা পর্যন্ত হিসাবগুলোতে জমা রয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি ও কম প্রকৃত মুনাফার মধ্যেও সাধারণ মানুষ নিরাপত্তার কারণে ব্যাংকেই সঞ্চয় রাখতে আগ্রহী হয়েছেন।

অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণও বেড়েছে। মার্চ শেষে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ ৮৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে শিল্প খাতে ৪৫ শতাংশ, ব্যবসা ও বাণিজ্যে ৩২ শতাংশ, ভোক্তা ঋণে ৯ শতাংশ, নির্মাণে ৭ শতাংশ এবং কৃষি ও বনায়নে ৪ শতাংশ ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। তবে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বিবেচনায় বিদেশি ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণ প্রায় ১০.৯ শতাংশ কমিয়েছে।

তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র খেলাপি ঋণে। ২০২৫ সালের মার্চে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২৪.৬ শতাংশ। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর ৩১.২ শতাংশ এবং ২০২৬ সালের মার্চে রেকর্ড ৩২.৭ শতাংশে পৌঁছেছে।

ব্যাংকভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের হার সর্বোচ্চ ৫৮.৪ শতাংশ। চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকে এই হার ৫২.২ শতাংশ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে ৪২ শতাংশ। বিপরীতে কঠোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কারণে বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার মাত্র ৬.৩ শতাংশ।

প্রতিবেদনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য হলো, বড় অঙ্কের ঋণেই খেলাপির ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। ৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপির হার ৪২.৫ শতাংশে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, বড় করপোরেট গ্রুপ এবং ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

অন্যদিকে ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের অবস্থাও অবনতির দিকে। এক কোটি টাকা পর্যন্ত খেলাপি হিসাবের সংখ্যা এক বছরে ২১ লাখ ৬৩ হাজার থেকে বেড়ে ৪৫ লাখ ৪৩ হাজারে দাঁড়িয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ব্যবসায়িক মন্দার কারণে ছোট উদ্যোক্তা ও ব্যক্তিগত ঋণগ্রহীতাদের পরিশোধ সক্ষমতা কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বৃহৎ শিল্পে মোট ঋণের ৫৮.৭ শতাংশ বিতরণ হয়েছে এবং সেখানে খেলাপির হার ৩৯.১ শতাংশ। তবে শতকরা হিসাবে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে কুটির শিল্প, যেখানে খেলাপি ঋণের হার ৫২.৮ শতাংশ।

প্রতিবেদনটি নারীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ইতিবাচক দিকও তুলে ধরেছে। মোট গৃহস্থালি আমানত হিসাবের ৩৮.৬ শতাংশ নারীদের নামে, যেখানে জমার পরিমাণ ৪ লাখ ৭ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। তবে ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে নারীর অংশীদারিত্ব মাত্র ১৮.৪ শতাংশ।

এদিকে ব্যাংকিং খাতের গড় ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) ৮২.৭ শতাংশে নেমে এলেও ইসলামী ব্যাংকগুলোতে তা এখনো ১২০.৩ শতাংশ এবং চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংকে ১০১.৬ শতাংশ। অর্থাৎ এসব ব্যাংক আমানতের তুলনায় অনেক বেশি ঋণ বিতরণ করেছে, যা তারল্য ঝুঁকি আরও বাড়াতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছে, আমানতকারীদের আস্থা এখনো ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় শক্তি। তবে বড় খেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, ঋণ আদায়ে কঠোরতা, এডিআর সীমা কঠোরভাবে অনুসরণ এবং সুশাসন নিশ্চিত করা না গেলে এই আস্থাও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top