হুন্ডির দাপট কমিয়ে বৈধ পথে প্রবাসী আয় বাড়াতে এবং রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ কমাতে বিশ্বমানের ‘ইনক্লুসিভ ইনস্ট্যান্ট পেমেন্ট সিস্টেম (আইআইপিএস)’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই অবকাঠামো কার্যকর হলে শুধু বৈধ রেমিট্যান্সই বাড়বে না, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ সঞ্চয় ও বিনিয়োগে যুক্ত হয়ে দেশের আর্থিক খাতেও নতুন গতি আনবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নেতৃত্বে উন্মুক্ত ডিজিটাল অবকাঠামোর ভিত্তিতে গড়ে উঠতে যাওয়া এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এবং অন্যান্য পেমেন্ট সেবাদাতার মধ্যে ২৪ ঘণ্টা তাৎক্ষণিক, স্বল্প ব্যয় ও আন্তঃপরিচালনযোগ্য লেনদেন সম্ভব হবে। নীতিনির্ধারকদের আশা, এর ফলে রেমিট্যান্স পাঠাতে হুন্ডির প্রয়োজনীয়তা কমবে, বৈধ চ্যানেলের ব্যবহার বাড়বে এবং ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থায় যুক্ত হবে আরও কোটি মানুষ।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) গেটস ফাউন্ডেশনের সহায়তায় আয়োজিত ‘বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক তাৎক্ষণিক পেমেন্ট সিস্টেম (আইআইপিএস) বিশ্লেষণ এবং আন্তঃসীমান্ত রেমিট্যান্স’ শীর্ষক কর্মশালায় এসব তথ্য ও গবেষণা তুলে ধরা হয়।
পিআরআইর সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মডেলিং অনুযায়ী, বাংলাদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তঃপরিচালনযোগ্য ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো চালু করা গেলে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচ রেকর্ড পরিমাণ কমে আসবে। বর্তমানে বিশ্বে গড়ে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রায় ৬.৫ শতাংশ খরচ হলেও সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের মতো দেশে তা ১ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে। একই ধরনের ব্যবস্থা বাংলাদেশে কার্যকর করা গেলে শুধু লেনদেন ব্যয় কমিয়েই প্রবাসীরা বছরে ২৫০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারবেন।
পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার বলেন, বর্তমানে রেমিট্যান্স দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৬ শতাংশের সমান। এই অর্থ শুধু ভোগে সীমাবদ্ধ না রেখে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে প্রবাহিত করার জন্য আধুনিক ডিজিটাল আর্থিক অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, ওমানে অবস্থানরত প্রায় সাত লাখ বাংলাদেশির বড় অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বদলে হুন্ডি ব্যবহার করেন।
গবেষণা পরিচালক ড. বজলুল হক খন্দকার বলেন, আইআইপিএস চালু হলে ব্যাংক, এমএফএস ও অন্যান্য আর্থিক সেবাদাতার মধ্যে বাধাহীন সংযোগ তৈরি হবে। এতে আন্তঃসীমান্ত রেমিট্যান্স দ্রুত, নিরাপদ ও কম খরচে দেশে আনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বাজার কাঠামো, নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা এবং ব্যবহারকারীর আচরণ বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ নীতিসুপারিশও তৈরি করা হবে।
পিআরআই পরিচালক ড. এম. এ. রাজ্জাক বলেন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত মোট ৬ হাজার ৬০০ বাংলাদেশি অভিবাসী এবং তাঁদের পরিবারের ওপর জরিপ চালানো হচ্ছে। এই গবেষণায় খতিয়ে দেখা হবে কেন অনেক প্রবাসী ব্যাংকের পরিবর্তে হুন্ডি ব্যবহার করেন। লেনদেন ব্যয়, বিনিময় হার, গতি, নথিপত্রের জটিলতা ও আস্থার বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করে নতুন পেমেন্ট ব্যবস্থা নকশা করা হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর মহাপরিচালক ড. এজাজুল ইসলাম বলেন, আইআইপিএস ডিজিটাল লেনদেনের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াবে এবং দেশের পেমেন্ট ইকোসিস্টেমকে আরও দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ জাহিদ ইকবাল জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক উন্মুক্ত উৎসভিত্তিক ‘মজালুপ’ (এমওজেএএলওওপি) প্ল্যাটফর্মের ওপর ভিত্তি করে আইআইপিএস তৈরি করছে। এর মাধ্যমে ব্যাংক, পেমেন্ট সেবাদাতা এবং ভবিষ্যতে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকেও একই ডিজিটাল অবকাঠামোর আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, নতুন ব্যবস্থায় ফিচার ফোন ব্যবহারকারীরাও সেবা নিতে পারবেন, হিসাব খোলা সহজ হবে, ব্যর্থ লেনদেন কমবে এবং জালিয়াতি প্রতিরোধে উন্নত প্রযুক্তি যুক্ত হবে।
পিআরআইর গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দেশে ব্যাংক ও এমএফএস হিসাবের সংখ্যা বাড়লেও সেগুলোর সক্রিয় ব্যবহার কমছে। বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ফাইন্ডেক্স ২০২৫ অনুযায়ী, বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্কদের ৪৩ শতাংশের ব্যাংক বা আর্থিক হিসাব থাকলেও নিয়মিত ডিজিটাল লেনদেন করেন মাত্র ৩৪ শতাংশ। অধিকাংশ গ্রাহক রেমিট্যান্স বা অর্থ পাওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে নগদ তুলে নিচ্ছেন, ফলে সেই অর্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদে থেকে সঞ্চয় বা বিনিয়োগে রূপান্তরিত হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইআইপিএস চালু হলে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ সরাসরি ব্যাংক হিসাব বা ডিজিটাল ওয়ালেটে জমা হবে। সেই হিসাবের ভিত্তিতে গ্রাহকরা সহজেই সঞ্চয় প্রকল্প, ক্ষুদ্রঋণ, জীবন ও স্বাস্থ্যবীমাসহ অন্যান্য আর্থিক সেবার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন। ফলে রেমিট্যান্স শুধু পারিবারিক ব্যয় নির্বাহের উৎস না হয়ে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ সৃষ্টির ভিত্তিতেও পরিণত হবে।
সমাপনী বক্তব্যে পিআরআইর সম্মাননীয় ফেলো ড. আহসান এইচ. মনসুর বলেন, নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। তাই ডিজিটাল লেনদেনের খরচ কমিয়ে এর ব্যবহার বাড়ানো এখন অর্থনৈতিক প্রয়োজন। একই সঙ্গে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলে বৈধ রেমিট্যান্সের প্রবাহ আরও শক্তিশালী হবে এবং অনাবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকেও বছরে ২০০ থেকে ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব হতে পারে।













