ব্যাংক থেকে টাকা উঠছে, কিন্তু সেই টাকা কতটা আবার ব্যাংকে ফিরছে—এখন সেটিই অর্থনীতির জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে মে—মাত্র এক মাসে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে থাকা নগদ অর্থ বেড়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে প্রায় সমপরিমাণ বেড়েছে রিজার্ভ মানি বা ছাপানো টাকার স্থিতি।
এতে একটি বিষয় স্পষ্ট হচ্ছে: মে মাসে শুধু লেনদেনের চাহিদাই বাড়েনি, অর্থনীতিতে নগদ টাকার ওপর নির্ভরশীলতাও হঠাৎ বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলে ব্যাংকের বাইরে মানুষের হাতে নগদ অর্থ ছিল ২ লাখ ৯৯ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। মে মাসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক মাসে বেড়েছে ৪৯ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা।
একই সময়ে রিজার্ভ মানি বেড়েছে ৫০ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। এপ্রিলে রিজার্ভ মানি ছিল ৪ লাখ ৩৫ হাজার ৪০৭ কোটি ১০ লাখ টাকা; মে মাসে তা দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪২ কোটি ১০ লাখ টাকায়।
নগদ অর্থ ও রিজার্ভ মানির এই প্রায় সমান্তরাল বৃদ্ধি অর্থনীতিবিদদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করছে। কারণ, এটি কেবল ঈদকেন্দ্রিক সাময়িক নগদ চাহিদার ফল কি না, নাকি ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে টাকা ধরে রাখার প্রবণতা আবার বাড়ছে—তা দেখতে হবে পরবর্তি মাসগুলোর তথ্য দিয়ে।
সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে আনতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে, ঠিক তার আগেই ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ বেরিয়ে গেছে। ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি ১ জুলাই বাংলা কিউআর চালু করেছে। এই ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো ছোট-বড় লেনদেনে নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল পেমেন্টকে সহজ করা। তবে সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, প্রযুক্তিনির্ভর লেনদেনের উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকের আস্থা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. এজাজুল ইসলাম বলেন, মে মাসে নগদ টাকা বাড়ার পেছনে দুটি কারণ কাজ করতে পারে। প্রথমত, মাসের শেষ দিকে কোরবানির ঈদ হওয়ায় পশু কেনাবেচা ও অন্যান্য ব্যয়ের জন্য মানুষ ব্যাংক থেকে নগদ টাকা তুলেছে। দ্বিতীয়ত, কিছু ব্যাংক নিয়ে গ্রাহকদের আস্থার সংকটও এর একটি কারণ হতে পারে।
তিনি বলেন, ঈদের সময় গরু ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের হাতে নগদ লেনদেন বাড়ে। তবে ওই টাকা ঈদের পর আবার ব্যাংকে ফেরত আসে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। টাকা দীর্ঘদিন ব্যাংকের বাইরে থাকলে ব্যাংকের আমানত কমে যায়। ফলে ব্যাংকগুলোর ঋণ ও বিনিয়োগ সক্ষমতা দুর্বল হয়, যা ব্যবসা সম্প্রসারণ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানও মনে করেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিসহ কয়েকটি ব্যাংক থেকে টাকা তোলার প্রবণতা অন্য সময়ের তুলনায় বেশি ছিল। এ কারণেও ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থ বেড়ে থাকতে পারে।
তবে মে মাসের উল্লম্ফনকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা যাচ্ছে না। চলতি বছরের শুরু থেকেই মানুষের হাতে নগদ অর্থ বাড়ছিল। জানুয়ারিতে এর পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে হয় ২ লাখ ৮৬ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা এবং মার্চে ৩ লাখ ৩ হাজার ১৮ কোটি টাকা। এপ্রিলে সামান্য কমলেও মে মাসে হঠাৎ বড় লাফ দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখানে দুটি অর্থনীতি পাশাপাশি কাজ করছে—একটি ব্যাংকনির্ভর অর্থনীতি, অন্যটি নগদনির্ভর অর্থনীতি। যখন মানুষের আস্থা কমে বা বড় ব্যয়ের মৌসুম আসে, তখন দ্বিতীয় অর্থনীতিটি দ্রুত বড় হয়ে ওঠে। মে মাসের তথ্য সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।
গত কয়েক বছরে ব্যাংক খাতের অনিয়ম, দুর্নীতি ও তারল্যসংকটের কারণে অনেক গ্রাহক ব্যাংকে টাকা রাখার বিষয়ে সতর্ক হয়ে পড়েন। ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও পরবর্তী সময়ে কিছুটা আস্থা ফেরায় সেই প্রবণতায় পরিবর্তন আসে। কিন্তু সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, আস্থার সেই পুনরুদ্ধার এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি।
অর্থনীতির জন্য আগামী মাসগুলো তাই গুরুত্বপূর্ণ। ঈদ-পরবর্তী সময়ে এই নগদ টাকা ব্যাংকে ফিরে এলে মে মাসের বৃদ্ধি মৌসুমি ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হবে। কিন্তু টাকা যদি মানুষের হাতে বা অনানুষ্ঠানিক লেনদেনে থেকে যায়, তাহলে সেটি ব্যাংক খাতের আমানত, বিনিয়োগ ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক গতিশীলতার জন্য নতুন সতর্কসংকেত হয়ে উঠতে পারে।













