উৎসে কর (উইথহোল্ডিং ট্যাক্স) সঠিকভাবে কাটা ও সরকারি কোষাগারে জমা নিশ্চিত করতে দেশজুড়ে বিশেষ মনিটরিং ও যাচাইকরণ কার্যক্রম শুরু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে কর কর্মকর্তাদের আইনগত ক্ষমতার বিষয়টি আবারও সামনে এনে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং করদাতাদের সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
একই সঙ্গে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৪৭ অনুযায়ী কর কর্মকর্তারা প্রয়োজনে কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ, হিসাবপত্র ও ডিজিটাল তথ্য পরীক্ষা, এমনকি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে নথিপত্র ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস সাময়িকভাবে জব্দ করার ক্ষমতা রাখেন বলেও জানিয়েছে এনবিআর।
শনিবার (১৯ জুলাই) জারি করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এনবিআর জানায়, তাদের নির্দেশনায় দেশের বিভিন্ন কর অঞ্চলের বিশেষ টিম উৎসে কর কর্তন, জমা এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের সত্যতা যাচাইয়ে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম জোরদার করেছে। এই কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য হলো উৎসে কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, কর ফাঁকি প্রতিরোধ করা এবং সরকারের রাজস্ব আহরণ আরও কার্যকর করা।
এনবিআর বলেছে, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৪৭ কর কর্মকর্তাদের অনুসন্ধান ও যাচাইকরণসংক্রান্ত নির্দিষ্ট ক্ষমতা দিয়েছে। এই ধারার আওতায় কর কর্মকর্তারা যেকোনো বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়, ব্যবসা কেন্দ্র বা সংশ্লিষ্ট প্রাঙ্গণে প্রবেশ করে সরেজমিন পরিদর্শন করতে পারবেন।
এ ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানের হিসাবের বই, ভাউচার, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, রসিদ, উৎসে কর কর্তনের হিসাব এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমসংক্রান্ত অন্যান্য নথিপত্র পরীক্ষা বা তলব করার ক্ষমতাও রয়েছে তাঁদের। প্রয়োজনে এসব নথির কপি সংগ্রহ, সনাক্তকরণ চিহ্ন বা সিলমোহর ব্যবহার এবং পরবর্তী তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ করা যাবে।
ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার বিবেচনায় আইনটি কর কর্মকর্তাদের তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক অনুসন্ধানের ক্ষমতাও দিয়েছে। এনবিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার সিস্টেম, ক্লাউড সার্ভার, ডিজিটাল রেকর্ড কিংবা ইলেকট্রনিক ডিভাইসে সংরক্ষিত তথ্য পরীক্ষা করা যাবে। প্রয়োজন হলে পাসওয়ার্ড বা এনক্রিপশন ভেঙেও সংশ্লিষ্ট তথ্যে প্রবেশের আইনগত সুযোগ রয়েছে।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, উৎসে কর্তিত করের সত্যতা যাচাইয়ের প্রয়োজনে হিসাবের খাতা, নথিপত্র, ইলেকট্রনিক রেকর্ড বা ডিজিটাল ডিভাইস সাময়িকভাবে জব্দ করে কর কর্তৃপক্ষের হেফাজতে রাখার ক্ষমতাও ধারা ১৪৭-এ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এনবিআর সতর্ক করে বলেছে, রাজস্ব আহরণের এই কার্যক্রমে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি, অসহযোগিতা বা তদন্তে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করলে আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৪৭(২) অনুযায়ী জরিমানা আরোপ করা হতে পারে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে করদাতাদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, উৎসে কর্তিত কর সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সময় অবশ্যই সঠিক আইনগত ধারা এবং নির্ধারিত অর্থনৈতিক কোড উল্লেখ করে ই-চালানের মাধ্যমে অর্থ জমা দিতে হবে। এতে কর জমা-সংক্রান্ত ভুল, বিভ্রান্তি এবং পরবর্তী জটিলতা এড়ানো সম্ভব হবে।
এনবিআর আরও জানিয়েছে, ধারা ১৪৭ প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো অস্পষ্টতা, জটিলতা, হয়রানি বা সংক্ষুব্ধতার ঘটনা ঘটলে করদাতারা সরাসরি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ১৪৭ ধারাসংক্রান্ত কমিটির সদস্যসচিবের কাছে নির্ধারিত ই-মেইল ঠিকানায় অভিযোগ বা মতামত জানাতে পারবেন। এর মাধ্যমে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করারও চেষ্টা করা হচ্ছে।
কর বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎসে কর ব্যবস্থায় সঠিকভাবে কর কর্তন ও জমা নিশ্চিত করা গেলে সরকারের রাজস্ব আহরণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। একই সঙ্গে কর প্রশাসনের নজরদারি জোরদার হওয়ার ফলে কর ফাঁকি ও উৎসে কর জমা না দেওয়ার প্রবণতাও কমবে। তবে এ ধরনের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আইনানুগতা, স্বচ্ছতা এবং করদাতার অধিকার রক্ষার বিষয়টিও সমানভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।













