হালাল সনদে ‘ঘুষ’ ও হয়রানির অভিযোগ

DSJ Web Photo July 18 2026 ExportDiversification
ছবি- বিসিআই

হালাল সার্টিফিকেট পেতে ঘুষ, অতিরিক্ত ফি, অপ্রয়োজনীয় ল্যাব পরীক্ষা, বারবার কারখানা পরিদর্শন এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন দেশের শীর্ষ রপ্তানিকারকরা।

তাদের দাবি, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বর্তমান সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা ব্যবসাবান্ধব নয়; বরং এটি উদ্যোক্তাদের আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং অনেক প্রতিষ্ঠানকে ভারত, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের স্বীকৃত সংস্থা থেকে দ্বিতীয়বার হালাল সনদ নিতে বাধ্য করছে। ফলে বিশ্বের দ্রুত সম্প্রসারণশীল ট্রিলিয়ন ডলারের হালাল বাজারে বড় সুযোগ হারাচ্ছে বাংলাদেশ।

শনিবার রাজধানীতে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) আয়োজিত ‘রপ্তানি বহুমুখীকরণে হালালের ভূমিকা’ শীর্ষক কর্মশালায় দেশের শীর্ষ খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা প্রকাশ্যে এসব অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে তারা মালয়েশিয়া ও তুরস্কের আদলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি একক জাতীয় হালাল অথরিটি গঠনের দাবি জানান।

কর্মশালায় সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ করেন বোম্বে সুইটস অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার খুরশিদ আহমেদ ফারহাদ। তিনি বলেন, কয়েকটি পণ্যের হালাল সার্টিফিকেটের জন্য তাদের প্রতিষ্ঠান প্রথমে ১৬ থেকে ১৮ লাখ টাকা ফি দেয়। পরে ফি কমানো হলেও প্রায় ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধের পরও এখন পর্যন্ত সনদ হাতে পায়নি প্রতিষ্ঠানটি।

তার অভিযোগ, সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়ায় একের পর এক ল্যাবরেটরি রিপোর্ট, পুনঃপুন কারখানা পরিদর্শন এবং এমনকি ভারী ধাতু ও কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষার রিপোর্টও চাওয়া হয়, অথচ এসব পরীক্ষার অবকাঠামো বাংলাদেশেই পর্যাপ্তভাবে নেই।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, “হালাল সার্টিফিকেট নিতে গিয়ে একটি ‘নন-হালাল’ কাজ করতে হয়—ঘুষ দিতে হয়।”

ফারহাদের অভিযোগ, শুধু প্রশাসনিক জটিলতাই নয়, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সংকটও বড় সমস্যা। তার দাবি, বিএসটিআই ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন—কোনোটিই সৌদি আরবের স্বীকৃত হালাল অ্যাক্রেডিটেশন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনপ্রাপ্ত নয়। ফলে সৌদি আরবে পণ্য রপ্তানি করতে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভারত, সিঙ্গাপুর বা থাইল্যান্ডের স্বীকৃত সংস্থা থেকে আবার নতুন করে সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতে হয়।

এর ফলে তাদের প্রতিষ্ঠানকে ২০০টির বেশি পণ্যের মধ্যে প্রায় ৫০টি পণ্যের মোড়ক থেকে হালাল লোগো সরিয়ে ফেলতে হয়েছে। শুধু প্যাকেজিং পরিবর্তনেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬২ লাখ টাকা।

একই ধরনের অভিযোগ করেন বিসিআই পরিচালক এবং ইজি প্রসেস ফুডসের চেয়ারম্যান জিয়া হায়দার মিঠু। তিনি বলেন, কারখানা পরিদর্শনের সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বড় দল নিয়ে যাওয়ার কথা বলে উদ্যোক্তাদের পরিবহন ও আপ্যায়নের ব্যবস্থা করতে বলেন।

তার ভাষায়, “ওনারা বলেন, বড় টিম যাবে, গাড়ির ব্যবস্থা করতে হবে, খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। এরপর ২০০ টন রপ্তানির জন্য বছরে দুই লাখ টাকা ফি দিতে হয়। হাজার হাজার পণ্যের জন্য যদি এভাবে খরচ করতে হয়, তাহলে ওই সার্টিফিকেটের প্রয়োজনই নেই।”

তিনি আরও বলেন, বিদেশি অনেক ক্রেতাই বাংলাদেশের সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়ার ব্যয় ও জটিলতার কথা জেনে আনুষ্ঠানিক সনদ নেওয়ার পরিবর্তে শুধু পণ্যের মোড়কে ‘হালাল’ শব্দটি ব্যবহার করার পরামর্শ দেন।

কর্মশালায় প্রাণ, প্যারাগন, আকিজ, মেঘনা গ্রুপ, বেঙ্গল মিটসহ দেশের অন্যতম বড় হালাল রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরাও ব্যবসায়ীদের এসব অভিযোগের প্রতি সমর্থন জানান। তাদের মতে, বর্তমান ব্যবস্থায় প্রকৃত উদ্যোক্তারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন এবং এতে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান আরিফ বলেন, বর্তমানে বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতির আকার প্রায় ৫.২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। অথচ বাংলাদেশ এখনো মূলত খাদ্য ও কৃষিপণ্য রপ্তানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

তিনি বলেন, প্রসাধনী, ওষুধ, ফ্যাশন, টেক্সটাইল, পর্যটন, উৎপাদন সরবরাহ শৃঙ্খল, ফিনটেক, শিক্ষা ও গবেষণাসহ আরও বহু খাতে বাংলাদেশের প্রবেশের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য একটি একক সার্টিফিকেশন কর্তৃপক্ষ না থাকায় সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

তার মতে, মালয়েশিয়া বা তুরস্কের মতো একটি জাতীয় হালাল অথরিটি গঠন করা গেলে বাংলাদেশের রপ্তানিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকারী আইইউবিএটির বিজনেস স্কুলের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মোমিনুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে বিএসটিআই ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন আলাদাভাবে হালাল সনদ দেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের কান্ট্রি ব্র্যান্ডিং দুর্বল হচ্ছে। একটি একক হালাল বোর্ড গঠন ছাড়া এই সংকট দূর করা কঠিন হবে।

বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় প্রায় ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার প্রায় ৮২ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। বিপরীতে হালাল পণ্যের রপ্তানি মাত্র ৮৫০ মিলিয়ন ডলার।

তিনি বলেন, বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীর দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো হালাল অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারেনি। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক হালাল বাজারের আকার ছিল ৩.৩ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ২০৩৪ সালে ৯.৪৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু বিশ্বের মোট চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ পণ্য এখন বাজারে সরবরাহ করা যাচ্ছে।

তার ভাষায়, “হালাল শুধু খাদ্য নয়; ওষুধ, প্রসাধনী, টেক্সটাইল, শিল্পপণ্য, পর্যটন ও সেবাখাত—সবকিছুই এর আওতায় আসে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একক সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা, শক্তিশালী ল্যাবরেটরি এবং কার্যকর ব্র্যান্ডিং গড়ে তুলতে পারলে অল্প সময়েই বাংলাদেশের রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।”

কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞরা একাধিক সুপারিশ তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে—আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একক জাতীয় হালাল অথরিটি গঠন, বিএসটিআই ও ইসলামিক ফাউন্ডেশনের দ্বৈত সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা পুনর্বিবেচনা, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার সম্প্রসারণ, উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত অভিন্ন হালাল মানদণ্ড নিশ্চিত করা, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও সৌদি আরবের সফল মডেল অনুসরণ এবং সরকার-বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ হালাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top