আইপিওতে নজিরবিহীন জালিয়াতি, সঙ্গী ছিল স্বয়ং কমিশন

WhatsApp Image 2026 07 14 at 2.50.28 AM
ডিএসজে কোলাজ

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির ইতিহাসে খুব কম ঘটনাই একমি পেস্টিসাইডস লিমিটেডের মতো এতগুলো গুরুতর প্রশ্ন একসঙ্গে সামনে এনেছে। একটি কোম্পানির বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর প্রসপেক্টাস, জাল বা বিকৃত ব্যাংক স্টেটমেন্ট, শেয়ারহোল্ডিংয়ে অনুমোদনহীন পরিবর্তন, আইপিওর অর্থ অপব্যবহার, প্রতিশ্রুত ঋণ পরিশোধ না করা, বিনিয়োগকারীদের অর্থ দিয়ে এফডিআর তৈরি করে তা অন্য ঋণের জামানত হিসেবে ব্যবহার—এসব অভিযোগই যথেষ্ট ছিল।

এসব অনিয়মের একাধিক ‘রেড ফ্ল্যাগ’ আইপিও অনুমোদনের আগেই কমিশনের নথিতে ধরাও পড়েছিল। তারপরও কোম্পানিটি বাজার থেকে ৩০ কোটি টাকা সংগ্রহের অনুমোদন পায়। পরে সেই আইপিও-সংক্রান্ত মূল ফাইলই কমিশন থেকে রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যায়।

এই কোম্পানির অনিয়মসহ মোট ১২টি ঘটনার তদন্ত করতে ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এক আদেশে টেরা রিসোর্সেস, ইউএসএ-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও পরামর্শক জিয়া উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে। ২০২৫ সালে জমা দেওয়া ওই প্রতিবেদনে একমি পেস্টিসাইডসের আইপিওকে ঘিরে সংঘটিত নজিরবিহীন জালিয়াতি এবং অনুমোদন প্রক্রিয়ায় কমিশনের শীর্ষ পর্যায়ের সংশ্লিষ্টতার নানা তথ্য উঠে এসেছে।

ঢাকা স্ট্রিট জার্নালের হাতে আসা কমিশনের হারিয়ে যাওয়া আইপিও ফাইলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) থেকে পাওয়া বিএসইসির ৭০ পৃষ্ঠার বেশি তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে প্রায় ৩ কোটি টাকার একটি কোম্পানিকে বিভিন্ন আর্থিক কৌশল ও প্লেসমেন্ট বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রায় ১০৫ কোটি টাকার প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হয়।
আইপিওর আগেই কোটি কোটি টাকার প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করে উদ্যোক্তারা বিপুল অর্থ তুলে নেন। প্লেসমেন্ট ও আইপিও মিলিয়ে প্রায় শত কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও উঠে এসেছে তদন্তে। সেই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যবহার হয়েছে, তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে কমিশনের নথিতে।

এসব তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিএসইসির তদন্ত কমিটি একমি পেস্টিসাইডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজা-উর-রহমান সিনহাসহ পরিচালনা পর্ষদ, ইস্যু ম্যানেজার শাহজালাল ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড, নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি কমিশনের অভ্যন্তরীণ নথি সংরক্ষণ, তদারকি ও জবাবদিহি ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করারও সুপারিশ করা হয়েছে।

তবে তদন্তে এত গুরুতর অনিয়ম ও জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ার পরও খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন কমিশন কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়নি। তদন্ত প্রতিবেদনটি দুদকে পাঠানোর মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকে।

কমিশনের নথিতেই ধরা পড়ে জালিয়াতির সূত্র
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইপিও অনুমোদনের প্রায় পাঁচ মাস আগে থেকেই বিএসইসির ক্যাপিটাল ইস্যু বিভাগ কোম্পানির জমা দেওয়া নথিপত্র যাচাই করে একের পর এক অসঙ্গতি শনাক্ত করতে শুরু করে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে সরাসরি সংগ্রহ করা তথ্যের সঙ্গে কোম্পানির দাখিল করা ব্যাংক স্টেটমেন্ট মিলিয়ে দেখা হলে গুরুতর অমিল ধরা পড়ে।

যেসব অর্থ কোম্পানি প্ল্যান্ট, যন্ত্রপাতি, ভবন নির্মাণ কিংবা ভূমি উন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়েছে বলে দাবি করেছিল, ব্যাংকের মূল নথিতে তার বড় অংশেরই ভিন্ন ব্যবহার দেখা যায়। কোথাও সেই অর্থ ব্যাংকঋণ সমন্বয়ে গেছে, কোথাও অন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হিসাবে স্থানান্তর হয়েছে, আবার কোথাও সিকিউরিটিজ প্রতিষ্ঠানে অর্থ পাঠানোর তথ্য পাওয়া যায়। তদন্ত কমিটি এসব অসঙ্গতিকেই আইপিও অনুমোদনের আগেই পাওয়া স্পষ্ট ‘রেড ফ্ল্যাগ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, এসব তথ্য শুধু নিচের স্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামও অফিস নোটে আর্থিক তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেন। অর্থাৎ কমিশনের সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত সন্দেহের বিষয়টি পৌঁছেছিল।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তৎকালীন উপপরিচালক মোল্লাহ মো. মিরাজ উস সুন্নাহর। কমিশনের নথিতে তিনি কোম্পানির বিভ্রান্তিকর প্রসপেক্টাস, সম্পাদিত ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ছুটির দিনে জমা দেওয়া ভ্যাট চালানসহ একাধিক অনিয়ম লিখিতভাবে উল্লেখ করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে তার পর্যবেক্ষণগুলোর সঙ্গে পরবর্তী অনুসন্ধানের তথ্যেরও মিল পাওয়া যায়।

বিএসইসির অফিস নোটে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত শেয়ার মানি ডিপোজিটের ২৬ কোটি ২২ লাখ টাকা বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে জমি কেনায় ব্যবহারের দাবি করা হলেও, সেই অর্থের একটি বড় অংশ জমির মালিকদের না দিয়ে একজন কর্মচারী—মো. আব্দুল মোমিন আখন্দের কাছে নগদে দেওয়া হয়েছিল। তদন্ত কমিটি মূল ফাইল না পাওয়ায় এই লেনদেনের পূর্ণ সত্যতা যাচাই করতে পারেনি, তবে ঘটনাটিকে সন্দেহজনক হিসেবে উল্লেখ করেছে।

এর মধ্যেই ঘটে আরও রহস্যজনক ঘটনা। তদন্ত শুরু হওয়ার সময় দেখা যায়, একমি পেস্টিসাইডসের আইপিও-সংক্রান্ত মূল ফাইলই বিএসইসি থেকে নিখোঁজ। ফলে তদন্ত কমিটিকে বিএসইসির বিভিন্ন বিভাগ, ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ, কোম্পানি এবং ইস্যু ম্যানেজারের কাছ থেকে নথি সংগ্রহ করে পুরো ফাইল পুনর্গঠন করতে হয়।

তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, মূল ফাইল হারিয়ে যাওয়ায় কমিশনে আগে জমা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ নথির পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক যাচাই আর সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে তারা এই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়নি যে, জাল নথি আড়াল করতেই ফাইলটি সরিয়ে ফেলা হয়ে থাকতে পারে।

তবে ঢাকা স্ট্রিট জার্নালের হাতে আসা হারিয়ে যাওয়া ফাইলের অংশে থাকা অফিস নোটগুলো থেকে দেখা যায়, ব্যাংক আল-ফালাহ, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক ও ঢাকা ব্যাংক থেকে পাওয়া মূল স্টেটমেন্টের সঙ্গে কোম্পানির জমা দেওয়া স্টেটমেন্টের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের কোনো মিল ছিল না।

হারিয়ে যাওয়া ফাইলের অংশে থাকা অফিস নোটগুলোতে আরও দেখা যায়, কোম্পানির দাখিল করা ব্যাংক হিসাবের তথ্যের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর মূল রেকর্ডের অসঙ্গতি ছিল ধারাবাহিক।

ব্যাংক আল-ফালাহর হিসাবে ২০১৯ সালের বিভিন্ন তারিখের ব্যালেন্স কোম্পানির দাখিল করা স্টেটমেন্টে পরিবর্তন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তৎকালীন উপপরিচালক মিরাজ উস সুন্নাহ। একইভাবে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের হিসাবে কোম্পানি দাবি করে, তিন দফায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা প্ল্যান্ট, যন্ত্রপাতি ও কার্যকরী মূলধনে ব্যয় হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকের মূল তথ্যে দেখা যায়, ওই অর্থ গেছে সিনহা সিকিউরিটিজে, যার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাও ছিলেন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজা-উর-রহমান সিনহা।

আরও দেখা যায়, ২০১৪ সালে ৪২ লাখ টাকা জমি ক্রয়ের ব্যয় দেখানো হলেও ব্যাংকের রেকর্ডে সেটি ছিল ব্যাংকঋণ পরিশোধ। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের হিসাবে প্ল্যান্ট ও জমি কেনার নামে দেখানো প্রায় ৫০ লাখ টাকা বাস্তবে পরিশোধ করা হয়েছে পদ্মা অয়েল কোম্পানিকে। যমুনা ব্যাংকের হিসাবে ভবন নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি কেনার নামে দেখানো ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা অন্য একজন ব্যক্তির হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। কয়েকটি বড় অঙ্কের অর্থ ভূমি উন্নয়ন বা ভবন নির্মাণের পরিবর্তে ব্যাংকঋণ সমন্বয়ে ব্যবহার হয়েছে বলেও তদন্তে উঠে আসে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ আসে ঢাকা ব্যাংকের স্টেটমেন্ট যাচাইয়ে। তদন্ত কমিটি নথিটি যাচাইয়ের জন্য ব্যাংকের ধানমন্ডি শাখায় পাঠালে ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি ঢাকা ব্যাংক লিখিতভাবে জানায়, কোম্পানির জমা দেওয়া স্টেটমেন্টটি সম্পূর্ণ জাল এবং ব্যাংক কখনো এমন কোনো স্টেটমেন্ট ইস্যু করেনি। এমনকি ভুয়া নথিতে ‘ধানমন্ডি’ শাখার বানানও ভুল করে ‘ধানমনি’ লেখা হয়েছিল। তদন্ত কমিটির মতে, এটি কমিশনকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে জাল ব্যাংক নথি তৈরির প্রমাণ।

শুধু ব্যাংক নথিই নয়, খসড়া প্রসপেক্টাসে সংযুক্ত কয়েকটি ভ্যাট চালান নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কমিশনের কর্মকর্তারা দেখতে পান, কিছু চালান ঈদের দিন ও শনিবারের মতো সরকারি ছুটির দিনে জমা হয়েছে। বিষয়টি যাচাই করতে বিএসইসি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) চিঠি পাঠালেও ‘গোপনীয়তার’ কারণ দেখিয়ে কোনো তথ্য দেয়নি সংস্থাটি। ফলে ভ্যাট চালানগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

এসব অনিয়ম, জাল নথি ও অসম্পূর্ণ তথ্যের পরও ফাইলটি ২০২১ সালের ১৮ জুলাই উপপরিচালক, পরিচালক ও নির্বাহী পরিচালকের মাধ্যমে কমিশনার ড. শেখ শামসুদ্দিন আহমেদের কাছে উপস্থাপন করা হয়। সেদিন কমিশনার নোটে লেখেন, “কোম্পানিটি এখনও কিছু সমস্যার সমাধান করেনি। তবে আমরা ফাইলটি আরও প্রসেস করতে পারি।” চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামও সেই নোটে সম্মতি দেন। বিএসইসির কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, “প্রসেস ফারদার” ছিল ফাইলটি কমিশনের সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের সংকেত। পরদিন ১৯ জুলাই ২০২১ কমিশন ৩০ কোটি টাকার আইপিও অনুমোদন দেয়।

অনুমোদনের পরও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, আইপিও অনুমোদনের পরও কোম্পানি প্রসপেক্টাসে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। ন্যাশনাল ফাইন্যান্স লিমিটেডের (এনএফএল) ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার ঋণ আইপিও থেকে অর্থ পাওয়ার দুই মাসের মধ্যে পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েই কোম্পানি অনাপত্তিপত্র (এনওসি) নিয়েছিল। কিন্তু ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর আইপিওর অর্থ হাতে পাওয়ার পরও ঋণ পরিশোধ করা হয়নি। একাধিক লিখিত তাগাদা ব্যর্থ হওয়ার পর এনএফএল বিএসইসি, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ এবং পরে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়।

উচ্চ আদালত শুধু কোম্পানির ব্যাংক হিসাবে ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা জব্দের নির্দেশই দেননি, একই সঙ্গে বিএসইসি, ডিএসই, সিএসই এবং ইস্যু ম্যানেজারের নিষ্ক্রিয়তার বৈধতা নিয়েও রুল জারি করেন।

তদন্তে আরও দেখা যায়, সম্মতিপত্র পাওয়ার পর কমিশনকে না জানিয়ে উদ্যোক্তাদের বড় অঙ্কের শেয়ার বিকল্প বিনিয়োগকারীদের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং খসড়া প্রসপেক্টাসে পরিবর্তন আনা হয়। প্রচলিত বিধি অনুযায়ী এমন পরিবর্তনে আইপিও বাতিল হওয়ার কথা থাকলেও তৎকালীন চেয়ারম্যান কেবল একটি সতর্কীকরণ চিঠি দিয়েই বিষয়টি নিষ্পত্তি করেন।

আইপিও থেকে সংগৃহীত অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রসপেক্টাসের শর্ত মানা হয়নি। ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৩০ কোটি টাকার মধ্যে প্রায় ২১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয় হলেও প্রতিশ্রুত ঋণ পরিশোধে সেই অর্থ ব্যবহার করা হয়নি। তদন্তে আরও দেখা যায়, আইপিওর অর্থ দিয়ে গঠিত এফডিআর পরে অন্য ঋণের জামানত (লিয়েন) হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা কমিশনের শর্তের সরাসরি লঙ্ঘন।

ভবন নির্মাণ, বিদ্যুৎ সংযোগ ও যন্ত্রপাতি কেনাসহ কয়েকটি বড় ব্যয়েও ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে কোটি কোটি টাকা নগদে পরিশোধ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় কোম্পানির পাশাপাশি আইপিও-পরবর্তী অর্থ ব্যবহারের নিরীক্ষা করা নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।

তদন্ত প্রতিবেদনে ইস্যু ম্যানেজার প্রতিষ্ঠান শাহজালাল ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইপিও অনুমোদনের আগে ইস্যু ম্যানেজার যথাযথ যাচাই-বাছাই সনদ (ডিউ ডিলিজেন্স সার্টিফিকেট) দিয়ে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছিল। নিরীক্ষকরাও আর্থিক বিবরণী ও আইপিও-পরবর্তী অর্থ ব্যবহারের প্রতিবেদন প্রত্যয়ন করেছিলেন। কিন্তু তদন্তে ব্যাংক তথ্য, আর্থিক বিবরণী ও প্রকৃত অর্থ ব্যবহারের মধ্যে গুরুতর অসঙ্গতি পাওয়ায় এসব প্রত্যয়নের পেশাগত গ্রহণযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর কমিশন সভায় শাহজালাল ইকুইটি ম্যানেজমেন্টের নিবন্ধন সনদ বাতিলের প্রক্রিয়া শুরুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা আজও হয়নি।

সাইবার জালিয়াতি
আইপিওর অর্থ ব্যবহারের সময়সীমা বাড়াতে ২০২৪ সালের ১০ জুন অনুষ্ঠিত ১৪তম বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের ন্যূনতম ৫১ শতাংশ ভোট প্রয়োজন ছিল। কোম্পানি সেই ভোট পাওয়ার দাবি করলেও ডিএসইর তদন্ত কর্মকর্তা রুমানা ফেরদৌস মৌ ডিজিটাল লগ বিশ্লেষণ করে দেখতে পান, একই আইপি ঠিকানা থেকে ৯৫ থেকে ১২১ বার পর্যন্ত লগইন করে ১ হাজার ২৪৬ জন শেয়ারহোল্ডারের উপস্থিতি দেখানো হয়েছে। তদন্ত কমিটির মতে, প্রয়োজনীয় ভোট আদৌ পাওয়া যায়নি এবং এটি গুরুতর সাইবার জালিয়াতির শামিল।

বিএসইসির তদন্ত কমিটি অতিরিক্ত পরিচালক মোল্লাহ মো. মিরাজ উস সুন্নাহ ছাড়া ফাইলটি নিখোঁজ হওয়ার আগে যেসব কর্মকর্তা ও সহায়ক কর্মী ফাইলটির হেফাজত বা প্রবেশাধিকার ভোগ করেছেন, তাদের ব্যক্তিগত ও যৌথ দায় নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। প্রতিবেদনে তৎকালীন পরিচালক মো. মনসুর রহমান, মো. ফখরুল ইসলাম মজুমদার ও নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল করিমের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ডিএসজেকে তারা সবাই ফাইল হারানোর ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, বিএসইসির দুটি পৃথক অভ্যন্তরীণ তদন্তেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো দায় প্রমাণিত হয়নি।
বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবুল কালাম ডিএসজেকে বলেন, মূল ফাইল হারিয়ে গেলেও তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় নথি পাওয়া গিয়েছিল। কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ছিল কমিশনের সামনে সব অনিয়ম তুলে ধরা এবং তারা সেটিই করেছেন। এরপর কমিশন অনুমোদন দিলে কর্মকর্তাদের আর কিছু করার ছিল না। তিনি আরও বলেন, ফাইল নিখোঁজের ঘটনায় বিএসইসির দুটি তদন্ত কমিটিই সংশ্লিষ্ট পরিচালক ও নির্বাহী পরিচালককে দায়মুক্তি দিয়েছে।

অন্যদিকে তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ রেজাউল করিমও বলেন, কমিশনের সামনে সব তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছিল, কিন্তু অনুমোদনের সিদ্ধান্ত কমিশনই নিয়েছে।

আইপিও অনুমোদনের সময় কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন মামলায় তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তৎকালীন কমিশনার ড. শেখ শামসুদ্দিন আহমেদের সঙ্গে মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

একমি পেস্টিসাইডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজা-উর-রহমান সিনহার সঙ্গেও একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি এবং পাঠানো বার্তারও জবাব দেননি। তবে তদন্ত কমিটির শুনানিতে তিনি লিখিত বক্তব্যে অভিযোগ করেন, আইপিও-সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্তে ইস্যু ম্যানেজার ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট কাজী সাইফুর রহমানের ভূমিকা ছিল। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, তৎকালীন এনবিআর কমিশনার মতিউর রহমান, শিবলী রুবাইয়াতের বন্ধু জাভেদ মতিন এবং একটি প্রভাবশালী চক্র তার স্বাক্ষর জাল করে প্লেসমেন্ট শেয়ার বণ্টনে হস্তক্ষেপ করেছিল।

অন্যদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুইজন প্লেসমেন্ট শেয়ারধারী ডিএসজেকে জানান, তারা কোম্পানির কাছ থেকে নয়, তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে শেয়ার কিনেছিলেন। লক-ইন সময়জুড়ে নিয়মিত লভ্যাংশ পেয়েছেন এবং কোম্পানির অনুমোদনেই সেই প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি হয়েছে। তাদের অভিযোগ, এখন জালিয়াতি ও অনিয়মের দায় এড়াতে কোম্পানির উদ্যোক্তা নির্দোষ প্লেসমেন্ট বিনিয়োগকারীদের জড়ানোর চেষ্টা করছে।

বিএসইসির তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, একমি পেস্টিসাইডসের আইপিও শুধু একটি কোম্পানির আর্থিক জালিয়াতির ঘটনা নয়; এটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি, নথি সংরক্ষণ, আইপিও যাচাই-বাছাই এবং পেশাদার মধ্যস্থতাকারীদের জবাবদিহি ব্যবস্থার দুর্বলতাও সামনে এনেছে। তদন্তে উত্থাপিত সুপারিশ বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের জালিয়াতির পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকে যাবে বলেও প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top