দেশের মোট সরকারি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে ৯ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ। ক্রমবর্ধমান ঋণের চাপ মোকাবিলায় সরকার এখন রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং কম সুদের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
শনিবার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্য গোলাম রসুলের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য ধীরে ধীরে ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করা। এজন্য কর ও কর-বহির্ভূত রাজস্ব আহরণ বাড়িয়ে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর কৌশল নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, চলতি অর্থবছরে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১০ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সরকারের বিশ্বাস, রাজস্ব বাড়াতে পারলে ধার নেওয়ার প্রয়োজনও ধীরে ধীরে কমে আসবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর ও টেকসই করতে সরকার মিডিয়াম-টার্ম ডেট ম্যানেজমেন্ট স্ট্র্যাটেজি (এমটিডিএস) বাস্তবায়ন করছে। এই কৌশলের মাধ্যমে ঋণের ব্যয় কমানো, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং সামগ্রিক ঋণপোর্টফোলিও আরও দক্ষভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে ঘোষিত নীতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে চায়, যেখানে প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হবে বিনিয়োগ, ঋণ নয়। সরকারি বিনিয়োগ থেকে আয় বাড়লে রাজস্বও বৃদ্ধি পাবে এবং বাজেট ঘাটতি পূরণে অতিরিক্ত ঋণের প্রয়োজন কমবে।
এ লক্ষ্যে অর্থায়নের উৎসেও বৈচিত্র্য আনা হচ্ছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, সুদের ব্যয় কমাতে সরকার সুকুক, অ্যাসেট সিকিউরিটাইজেশনসহ বিভিন্ন বিকল্প অর্থায়ন পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
বৈদেশিক ঋণের বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ভবিষ্যতেও দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ নেবে। তবে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এমন দীর্ঘমেয়াদি ঋণকে, যেগুলোর সুদের হার কম এবং পরিশোধের শর্ত তুলনামূলকভাবে অনুকূল।
সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর অপর এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৪ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করেছে। এর মধ্যে ৩ বিলিয়ন ডলার ছিল মূল ঋণ, আর ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার সুদ বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং বৈদেশিক ঋণকে টেকসই পর্যায়ে রাখার জন্য সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, বিদেশি ঋণনির্ভর প্রতিটি প্রকল্প অনুমোদনের আগে এখন কঠোর যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে, যাতে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে ঋণ নেওয়া না হয়। একই সঙ্গে বৈদেশিক অর্থায়নে বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পগুলো সরকারের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তাও মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
যদিও সরকার ঋণনির্ভরতা কমানোর কৌশলের কথা বলছে, তবু সরকারি ঋণের পরিমাণ ইতোমধ্যে ২২ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় আগামী বছরগুলোতে রাজস্ব আহরণ, বিনিয়োগের গতি এবং ঋণের কার্যকর ব্যবস্থাপনাই এই কৌশলের বাস্তব সফলতা নির্ধারণ করবে বলে অর্থনীতিবিদদের অভিমত।













