চলতি অর্থবছরেও ধীরগতির প্রবৃদ্ধি দেখছে এডিবি

Web Photo DSJ April 10 2026 ADB
ডিএসজে

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল রপ্তানি, বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতি এবং জ্বালানি খাতের দীর্ঘস্থায়ী সংকটের কারণে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রত্যাশার তুলনায় ধীর থাকবে বলে মনে করছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটির সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে।

একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৮ শতাংশে অবস্থান করবে বলে ধারণা করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সংকট, বৈশ্বিক বাণিজ্য অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাকে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে সংস্থাটি।

বুধবার (৯ জুলাই) প্রকাশিত এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (এডিও) জুলাই ২০২৬ প্রতিবেদনে এসব পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৭ শতাংশে সীমিত ছিল। তবে মূল্যস্ফীতির চাপ ধীরে ধীরে কিছুটা কমে এলে এবং কাঠামোগত সংস্কার এগোলে চলতি অর্থবছরে অর্থনীতিতে সীমিত পুনরুদ্ধার দেখা যেতে পারে।

এডিবির বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান আকিরা মাতসুনাগা বলেন, কঠিন বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির মধ্যেও শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং সেবা খাতের স্থিতিশীল কার্যক্রম বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সহায়তা করছে। তবে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার, বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করতে ধারাবাহিক সংস্কার প্রয়োজন। এসব সংস্কারই বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিকে আরও সহনশীল করে তুলবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনও অস্বস্তিকর উচ্চতায় থাকবে। এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি হবে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ, যা সংস্থাটির এপ্রিলের পূর্বাভাস ৮ দশমিক ৫ শতাংশের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি কমার গতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর হবে বলেই মনে করছে সংস্থাটি।

এর পেছনে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছে এডিবি। সম্প্রতি জ্বালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের প্রভাব এখনও পরিবহন ব্যয়, ইউটিলিটি সেবা এবং ভোক্তা পর্যায়ের পণ্যের দামে প্রতিফলিত হচ্ছে। পাশাপাশি বিনিময় হার সমন্বয়ের প্রভাব, খাদ্যপণ্যের উচ্চ মূল্য এবং সেবা খাতের মূল্যস্ফীতিও সামগ্রিক মূল্যচাপ দীর্ঘায়িত করছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেমিট্যান্স প্রবাহ শক্তিশালী থাকায় অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব তৈরি হলেও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ফলে ব্যক্তিখাতের ভোগ ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির গতি দুর্বল এবং আমদানি বৃদ্ধিও সীমিত থাকায় বেসরকারি বিনিয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ছে না।

এডিবির বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, সরবরাহ ব্যবস্থার দিক থেকেও একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, দুর্বল বৈদেশিক চাহিদা এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাত চাপে থাকবে। অন্যদিকে সারের ঘাটতির ঝুঁকির কারণে কৃষি উৎপাদনেও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হতে পারে। তবে রেমিট্যান্স-সমর্থিত পারিবারিক আয় বৃদ্ধির কারণে সেবা খাত প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ব্যবসা পরিচালনার বিধিবিধান সহজ করা, কর প্রশাসনে সংস্কার, সুশাসন জোরদার এবং রেমিট্যান্সে প্রণোদনা অব্যাহত থাকলে ভোগ ও বিনিয়োগ উভয় ক্ষেত্রেই ধীরে ধীরে উন্নতি হতে পারে। তবে ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ঘাটতি প্রবৃদ্ধিকে এখনও সীমিত রাখবে।

এডিবি সতর্ক করে বলেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে বহির্বিশ্বের ঝুঁকিও কম নয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও তীব্র হলে জ্বালানি ও সমুদ্রপথে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। এতে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক তেলের দাম বৃদ্ধি, উন্নত দেশগুলোর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ বা নতুন বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা এবং প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হলে বাংলাদেশের রপ্তানি আরও চাপের মুখে পড়তে পারে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বৈদেশিক অর্থায়নের কঠোর পরিবেশ, বিনিময় হার-সংক্রান্ত চাপ এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে। তাই সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি আর্থিক খাতের সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে এডিবি।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top