বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাকের প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়ানো। আর সেই বাস্তবতায় রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্পে ৩০ শতাংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজনের শর্ত পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)।
সংগঠনটির মতে, এই শর্ত কার্যকর হলে দেশীয় সুতা ও কাপড়ের ব্যবহার বাড়বে, শক্তিশালী হবে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প এবং রপ্তানিতে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও সুদৃঢ় হবে।
এই দাবিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে ছয় দফা প্রস্তাবসংবলিত একটি স্মারকলিপি দিয়েছে বিটিএমএ। সংগঠনটির সভাপতি শওকত আজিজ রাসেলের সই করা স্মারকলিপিতে প্রাথমিক টেক্সটাইল শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে করনীতি, শুল্কনীতি, নগদ সহায়তা এবং বিনিয়োগ-সহায়ক একাধিক নীতিগত পরিবর্তনের প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে।
বিটিএমএর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের প্রাথমিক টেক্সটাইল খাতে ১৮৮৩টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে মোট বিনিয়োগ ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। খাতটি বছরে অভ্যন্তরীণ সুতা ও বস্ত্র চাহিদা পূরণের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করছে। দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের ৮৫ শতাংশের বেশি সরবরাহ আসে এই শিল্প থেকেই। একই সঙ্গে জাতীয় জিডিপিতে খাতটির অবদান প্রায় ১৩ শতাংশ এবং প্রত্যক্ষভাবে প্রায় এক কোটি মানুষের জীবিকা এই শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংগঠনটির মতে, অতীতে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে স্থানীয় মূল্য সংযোজনের একটি ন্যূনতম শর্ত ছিল। পরে তা প্রত্যাহার করা হয়। এতে দেশীয় সুতা ও কাপড়ের ব্যবহার নিরুৎসাহিত হয়েছে এবং স্থানীয় স্পিনিং ও টেক্সটাইল মিলগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে।
এলডিসি-পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাজারে পণ্যের উৎস, স্থানীয় উৎপাদন এবং মূল্য সংযোজন-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক শর্ত পূরণে স্থানীয় মূল্য সংযোজনই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই ৩০ শতাংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজনের শর্ত পুনর্বহালকে এখন শিল্পটির টিকে থাকার অন্যতম পূর্বশর্ত হিসেবে দেখছে বিটিএমএ।
স্মারকলিপিতে দ্বিতীয় দাবিতে দেশীয় সুতা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে বর্তমানে দেওয়া ১.৫ শতাংশ নগদ সহায়তা বাড়িয়ে কমপক্ষে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিটিএমএর যুক্তি, এতে স্থানীয় সুতা ব্যবহারে উৎসাহ বাড়বে, দেশীয় শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি মূল্য সংযোজনও বাড়বে।
তৃতীয় দাবিতে প্রাথমিক টেক্সটাইল শিল্পের আয়কর হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১২ শতাংশে নামিয়ে আনার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংগঠনটির মতে, উৎপাদনমুখী এই শিল্পে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, বিদ্যমান কারখানার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত এই করহার বহাল রাখা প্রয়োজন।
চতুর্থ দাবিতে পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার (পলিয়েস্টার তন্তু), পিভিসি রেজিন এবং পিইটি রেজিনের ওপর বিদ্যমান ৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে বিটিএমএ। সংগঠনটির মতে, বিশ্ববাজারে ম্যান-মেড ফাইবারভিত্তিক পোশাকের চাহিদা দ্রুত বাড়লেও কাঁচামালের ওপর শুল্ক বহাল থাকায় দেশীয় শিল্প আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
এ ছাড়া নগদ সহায়তার ওপর উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে হ্রাসের প্রস্তাব ইতিবাচক হলেও সেটিকে চূড়ান্ত কর হিসেবে গণ্য করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখা এবং সাময়িক তারল্য সংকট মোকাবিলায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর আন্ত:কোম্পানি ঋণকে আয়কর আইনের কাল্পনিক সুদ-সংক্রান্ত বিধান থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাবও স্মারকলিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিটিএমএর ভাষ্য, এ ধরনের ঋণ মুনাফা অর্জনের জন্য নয়; বরং উৎপাদন ও ব্যবসায়িক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার একটি স্বীকৃত ব্যবসায়িক ব্যবস্থা।
স্মারকলিপিতে বিটিএমএ সতর্ক করে বলেছে, প্রাথমিক টেক্সটাইল শিল্প দুর্বল হয়ে পড়লে তৈরি পোশাক খাত ক্রমেই আমদানিনির্ভর হয়ে যাবে। এতে স্থানীয় মূল্য সংযোজন কমবে, রপ্তানির লিড টাইম বাড়বে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হবে এবং এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি এই খাতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিপুল ঋণ ও বিনিয়োগও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাই জাতীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন এবং রপ্তানি প্রবৃদ্ধির স্বার্থে ছয় দফা প্রস্তাব দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।













