একসময় ব্যাংকগুলোর সবচেয়ে নিরাপদ অর্থায়ন হিসেবে বিবেচিত হতো ট্রেড ফাইন্যান্স। কারণ, আমদানি বা রপ্তানির বিপরীতে দেওয়া এই অর্থায়ন পণ্য বিক্রি কিংবা রপ্তানি আয়ের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিশোধ হওয়ার কথা। কিন্তু সেই খাতই এখন ব্যাংকিং ব্যবস্থার নতুন ঝুঁকির উৎসে পরিণত হচ্ছে।
চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতে ৩ দশমিক ১২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিদেশি গৃহীত বিল বকেয়া রয়েছে। একই সময়ে ১ দশমিক ১২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি বিলও দেশে ফেরেনি। এসব দায়ের একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত ‘ফোর্সড লোন’ বা জোরপূর্বক ঋণে রূপ নিচ্ছে, যা ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ও সম্পদের গুণগত মানের ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ট্রেড ফাইন্যান্সে বড় ধরনের সম্পৃক্ততা রয়েছে—এমন ব্যাংকগুলোর ঋণ পোর্টফোলিওর মান ইতোমধ্যেই উদ্বেগজনকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এসব ব্যাংকে ট্রেড ফাইন্যান্স-সংশ্লিষ্ট খেলাপি ঋণের হার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ। আর যেসব ব্যাংকের সামগ্রিক খেলাপি ঋণও বেশি এবং একই সঙ্গে ট্রেড ফাইন্যান্সে উল্লেখযোগ্য সম্পৃক্ততা রয়েছে, সেখানে এই হার ৮০ শতাংশেরও বেশি।
মঙ্গলবার (৮ জুলাই) রাজধানীর মিরপুরে বিআইবিএম ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত ‘ট্রেড সার্ভিসেস অপারেশনস অব ব্যাংকস’ শীর্ষক পর্যালোচনা কর্মশালায় গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন বিআইবিএমের অধ্যাপক ড. শাহ মো. আহসান হাবীব।
গবেষণায় বলা হয়েছে, সমস্যার মূল সূত্র লুকিয়ে আছে নন-ফান্ডেড দায়ে। অর্থাৎ শুরুতে ব্যাংক সরাসরি ঋণ দেয় না; বরং ঋণপত্র (এলসি), ব্যাংক গ্যারান্টি বা অনুরূপ দায় গ্রহণ করে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে আমদানিকারক মূল্য পরিশোধ করতে না পারলে কিংবা রপ্তানিকারক সময়মতো রপ্তানি আয় দেশে আনতে ব্যর্থ হলে সেই দায় বাধ্য হয়ে ফোর্সড লোন বা জোরপূর্বক ঋণে পরিণত হয়।
ব্যাংকারদের ভাষায়, শুরুতে এটি কেবল একটি নিশ্চয়তার দায়। কিন্তু গ্রাহক ব্যর্থ হলে সেই দায়ই ব্যাংকের প্রকৃত ঋণে রূপ নেয়। আর দীর্ঘ সময় অনাদায়ী থাকলে সেটিই শেষ পর্যন্ত খেলাপি ঋণে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, মূলধনী যন্ত্রপাতি, তুলা, বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল, চিনি, সার, জ্বালানি এবং স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানির ক্ষেত্রে এ ধরনের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। বিপুল অঙ্কের ঋণপত্র খোলার পর অনেক আমদানিকারক সময়মতো দায় পরিশোধ করতে না পারায় ব্যাংকগুলো বাধ্য হয়ে সেগুলোকে ফোর্সড লোন হিসেবে হিসাবভুক্ত করছে। এর ফলে সম্পদের গুণগত মান দ্রুত অবনতি ঘটছে।
রপ্তানি অর্থায়নের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করেছে বিআইবিএম। গবেষণায় বলা হয়েছে, আইনগতভাবে কার্যকর ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি ছাড়া অথবা দুর্বল চুক্তির ভিত্তিতে ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র খোলার প্রবণতা বাড়ছে। মতামত জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় সব ব্যাংকারই বলেছেন, এ ধরনের চর্চার কারণেই রপ্তানি অর্থায়নের বড় একটি অংশ ঝুঁকির মুখে পড়ছে। প্রত্যাশিত রপ্তানি আয় সময়মতো দেশে না এলে অর্থায়নের স্বাভাবিক অর্থপ্রবাহ ভেঙে পড়ে এবং দায় দ্রুত ফোর্সড লোনে রূপ নেয়।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ড. শাহ মো. আহসান হাবীব বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং কিছু ক্ষেত্রে দুর্বল ঋণ মূল্যায়নের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ট্রেড ফাইন্যান্সের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে একসময় সবচেয়ে নিরাপদ হিসেবে বিবেচিত এই অর্থায়ন ব্যবস্থাও এখন অনেক ব্যাংকের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কর্মশালায় বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে আরও দ্রুত, নিরাপদ ও কাগজবিহীন করতে ইলেকট্রনিক বাণিজ্যিক দলিল ব্যবস্থার জন্য আধুনিক আইনগত ও ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি অর্থপাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন এবং বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার প্রতিরোধে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি আরও শক্তিশালী করতে হবে।
তিনি বলেন, উদ্ভাবনী আর্থিক পণ্য, কার্যকর ঝুঁকি ভাগাভাগি ব্যবস্থা এবং তথ্যভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ট্রেড ফাইন্যান্সের সুযোগ আরও বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে পণ্যভিত্তিক তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা, সম্পদের গুণগত মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং বাংলাদেশ ব্যাংক, তফসিলি ব্যাংক, শুল্ক কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।
কর্মশালায় অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করলেই এই সংকটের সমাধান হবে না। ঋণপত্র খোলার আগে কঠোর যাচাই-বাছাই, প্রকৃত আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম নিশ্চিত করা এবং সময়মতো রপ্তানি আয় দেশে ফেরানোর বিষয়েও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় ফোর্সড লোনের প্রবণতা আরও বাড়বে, যা ইতোমধ্যেই রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণের চাপে থাকা দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে।













