১৭.৭ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ঝুঁকিতে

DSJ Web Photo July 6 2026 LDCGraduation
ছবি: র‌্যাপিড

বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের শেষ পর্যায়ে, তখন দেশের রপ্তানি খাত নিয়ে উদ্বেগজনক সতর্কবার্তা দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, গত চার বছর ধরে রপ্তানি কার্যত স্থবির হয়ে আছে, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে না, রপ্তানি এখনও এককভাবে তৈরি পোশাক খাতনির্ভর এবং এলডিসি-পরবর্তী শুল্ক সুবিধা হারালে প্রায় ১৭.৭ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। প্রয়োজনীয় নীতিগত ও কাঠামোগত সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে।

রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (RAPID) আয়োজিত সাংবাদিকদের এক কর্মশালায় উপস্থাপিত গবেষণা এবং আলোচনায় দেশের রপ্তানি খাতের এই চিত্র উঠে আসে।

গবেষণায় বলা হয়, বৈশ্বিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না বাংলাদেশ। ২০২৫ সালে বিশ্ব রপ্তানি প্রায় ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ২ শতাংশ। একই সময়ে কম্বোডিয়ার রপ্তানি বেড়েছে ১৭.৩ শতাংশ এবং ভিয়েতনামের ১৬.৮ শতাংশ।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যও একই সংকেত দিচ্ছে। সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে দেশের পণ্য রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ০.৬ শতাংশ কমেছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি সাময়িক ওঠানামা নয়; বরং রপ্তানি খাতের গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। এর প্রভাব দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ২০১৪ সালে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৫ শতাংশ। এক দশকের ব্যবধানে সেই অনুপাত কমে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১০.৫ শতাংশে।

১৭ কোটিরও বেশি মানুষের দেশ বাংলাদেশ এখনও প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির সীমা অতিক্রম করতে পারেনি। অথচ একই সময়ে ভিয়েতনামের বার্ষিক রপ্তানি ৪৭৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবধানের অন্যতম কারণ বাংলাদেশের অতিমাত্রায় একক খাতনির্ভর রপ্তানি কাঠামো। বর্তমানে দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এই খাতে সামান্য ধাক্কাও পুরো অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

এই ঝুঁকি এলডিসি উত্তরণের পর আরও বাড়বে। বর্তমানে বাংলাদেশ এলডিসি হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার ভোগ করছে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা কার্যকর হওয়ার পর সেই সুবিধার বড় অংশ হারাবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ওপর শূন্য শুল্কের পরিবর্তে প্রায় ১২ শতাংশ এবং জুতা খাতে প্রায় ৬ শতাংশ শুল্ক আরোপ হবে।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) প্রাক্কলন অনুযায়ী, এর ফলে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৩২.২ শতাংশ, অর্থমূল্যে প্রায় ১৭.৭ বিলিয়ন ডলার, ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগবে ইউরোপীয় বাজারে।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার এলডিসি উত্তরণের সময় আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

কর্মশালায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বাংলাদেশ জাতিসংঘের কাছে এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করেছে। এই সময়ের মধ্যে সরকার নীতিগত সংস্কার, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে চায়।

তবে গবেষকরা মনে করেন, শুধু সময় বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। জাতিসংঘের Smooth Transition Strategy বাস্তবায়নের গতি এখনও সন্তোষজনক নয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে অতিরিক্ত সময়ও কাঙ্ক্ষিত সুফল নাও দিতে পারে।

কর্মশালায় বিদেশি বিনিয়োগের দুর্বল চিত্রও তুলে ধরা হয়। বর্তমানে জিডিপির তুলনায় বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) মাত্র ০.৯৫ শতাংশ, যেখানে কম্বোডিয়ায় এই হার প্রায় ৯.৮ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, জটিল করব্যবস্থা, ব্যবসা পরিচালনার উচ্চ ব্যয়, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে।

ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি দৌলত আক্তার মালা বলেন, শুধু কর্পোরেট কর নয়; বিভিন্ন সারচার্জ, ভ্যাট, অগ্রিম কর ও অন্যান্য চার্জ যুক্ত হয়ে অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর করের বোঝা প্রায় ৫৫ শতাংশে পৌঁছে যায়, যা বিনিয়োগের বড় বাধা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং রপ্তানির ভিত্তি সম্প্রসারণ।

তাদের মতে, নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি, উন্নত লজিস্টিকস, দ্রুত কাস্টমস সেবা, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং সহজ ব্যবসা পরিবেশ নিশ্চিত না হলে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। একই সঙ্গে তৈরি পোশাকের বাইরে ওষুধ, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত পণ্য, চামড়া, প্রকৌশল পণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পে বিনিয়োগ বাড়িয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপরও জোর দেন তারা।

অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এলডিসি থেকে উত্তরণ নয়; বরং উত্তরণের পর বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা। সেই লক্ষ্য অর্জনে এখনই কাঠামোগত সংস্কার শুরু না হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই দেশের রপ্তানি খাত আরও বড় চাপের মুখে পড়তে পারে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top