দেশীয় শিল্পায়ন ও উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে নতুন করে প্রায় ৬৫.১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা এসেছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) সঙ্গে পৃথক ভূমি লিজ চুক্তি করেছে গোল্ডেন অয়েল মিলস লিমিটেড ও ডেল্টা এপিআই লিমিটেড। দুটি প্রকল্পে মোট প্রায় ৬ হাজার ২০০ জনের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করছে বেজা।
রবিবার (৫ জুলাই) বেজার সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠান দুটির সঙ্গে ভূমি লিজ চুক্তি স্বাক্ষর হয়। বেজার কর্মকর্তাদের মতে, দেশীয় শিল্পগোষ্ঠীর এই নতুন বিনিয়োগ জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে সরকার উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানভিত্তিক শিল্পায়নকে আরও গতিশীল করতে চাইছে।
চুক্তি অনুযায়ী, গোল্ডেন অয়েল মিলস লিমিটেড জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ২০ একর জমিতে ৫২.৮০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করবে। প্রতিষ্ঠানটি খাদ্য ও কৃষিভিত্তিক পণ্য, ফ্রোজেন ফুড, আইসক্রিম, বিশেষায়িত তেল ও ফ্যাট, প্যাকেজিং, ব্যাকওয়ার্ড ইন্টিগ্রেশন এবং উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনে বিনিয়োগ করবে। প্রকল্পটি থেকে প্রায় ৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে জানানো হয়েছে।
গোল্ডেন গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এবং স্যাভয় আইসক্রিম এর স্বত্বাধিকারী ও গোল্ডেন অয়েল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়াজ আহমেদ বলেন, জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা শুধু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে চান না, বরং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের খাদ্যশিল্পকে আরও শক্তিশালী করতে দীর্ঘমেয়াদি অবদান রাখতে চান।
তবে তিনি অর্থনৈতিক অঞ্চলের কিছু বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন। বিশেষ করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ইউটিলিটি সেবা এবং শ্রমিক আবাসনের সমস্যার দ্রুত সমাধানে বেজার প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, এসব অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করা গেলে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল আরও প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।
অন্যদিকে ডেল্টা এপিআই লিমিটেড ১২ একর জমিতে ১২.৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করে অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই) উৎপাদন কারখানা স্থাপন করবে। এই প্রকল্পে প্রায় ২০০ জনের কর্মসংস্থান হবে।
বেজা জানিয়েছে, একই অর্থনৈতিক অঞ্চলে কোম্পানিটির জন্য আরও ৩০ একর জমি ইতোমধ্যে বরাদ্দ ও হস্তান্তর করা হয়েছে। সেখানে শিল্প স্থাপনের প্রয়োজনীয় অনুমোদন প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।
ডেল্টা এপিআইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাকির হোসেন বলেন, বাংলাদেশের ওষুধশিল্পকে কাঁচামাল উৎপাদনে আরও আত্মনির্ভর করে তুলতেই এই বিনিয়োগ। তার মতে, অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নত অবকাঠামো ও নীতিগত সহায়তা শিল্প সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে শ্রমিক আবাসনের জন্য পৃথক জমি বরাদ্দের ব্যবস্থাও চালুর অনুরোধ জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বেজার নির্বাহী সদস্য (ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন) সালেহ আহমদ বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। দ্রুত ও বিনিয়োগবান্ধব সেবা নিশ্চিত করে শিল্প স্থাপন এবং উৎপাদন শুরু করার সময় কমিয়ে আনাই এখন বেজার অগ্রাধিকার।
বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, বাংলাদেশ এখন শুধু উৎপাদনের গন্তব্য নয়, বরং আঞ্চলিক বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। দেশীয় শিল্পগোষ্ঠীর এই নতুন বিনিয়োগ অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, বেজার লক্ষ্য শুধু জমি বরাদ্দ দেওয়া নয়; বরং বিনিয়োগকারীরা যাতে দ্রুত শিল্প স্থাপন, উৎপাদন শুরু এবং রপ্তানিমুখী কার্যক্রম চালু করতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে এখনো কিছু অবকাঠামোগত ও পরিচালনাগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে এবং সেগুলো সমাধানে সরকার কাজ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং ফার্মাসিউটিক্যাল কাঁচামাল উৎপাদনে নতুন এই বিনিয়োগ দেশের শিল্প বহুমুখীকরণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে ওষুধশিল্পের কাঁচামাল দেশে উৎপাদন বাড়লে আমদানিনির্ভরতা কমার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে বৃহৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনৈতিক অঞ্চলের কার্যকারিতাও আরও দৃশ্যমান হবে।













