বৈশ্বিক চাহিদার দুর্বলতা, ইউরোপের কয়েকটি প্রধান বাজারে রপ্তানি কমে যাওয়া এবং উৎপাদন-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের প্রভাবে সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি সামান্য সংকুচিত হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সাময়িক তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরজুড়ে দেশের মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪৮.০০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ০.৫৮ শতাংশ কম।
তবে বছরজুড়ে মন্দার মধ্যেও শেষ মাস জুনে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। জুনে দেশের রপ্তানি আয় হয়েছে ৪.২০৩ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ২৫.৯১ শতাংশ বেশি। যদিও মে মাসের তুলনায় জুনের রপ্তানি ৪.৫৪ শতাংশ কমেছে, তবু বার্ষিক ভিত্তিতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি রপ্তানি খাতে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পণ্যভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রাথমিক ও শিল্পজাত—উভয় খাতেই সামান্য সংকোচন হয়েছে। প্রাথমিক পণ্য থেকে আয় হয়েছে ১.৪৪৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ০.৩২ শতাংশ কম। শিল্পজাত পণ্য থেকে আয় হয়েছে ৪৬.৫৫৮ বিলিয়ন ডলার, যা ০.৫৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
দেশের মোট রপ্তানির ৮০.৬২ শতাংশ এখনো তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাত থেকে এসেছে। বিদায়ী অর্থবছরে এই খাতের রপ্তানি আয় হয়েছে ৩৮.৭০১ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১.৬৪ শতাংশ কম। এর মধ্যে নিটওয়্যার রপ্তানি ২.৫৩ শতাংশ এবং ওভেন পোশাক ০.৬১ শতাংশ কমেছে।
অন্যদিকে তৈরি পোশাকের বাইরে কয়েকটি খাত উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ৭.০৯ শতাংশ বেড়ে ১.২২৬ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। পাট ও পাটজাত পণ্যে ৭.৭৫ শতাংশ, প্রকৌশল পণ্যে ২১.৭৭ শতাংশ, হোম টেক্সটাইলে ৬.৫২ শতাংশ এবং রাসায়নিক পণ্যে ৭.৭৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ওষুধ রপ্তানি বেড়েছে ১১.৮৮ শতাংশ, আর প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ৮.১৪ শতাংশ। তবে হস্তশিল্প, কাগজ ও কাগজজাত পণ্য এবং সিরামিক খাতে উল্লেখযোগ্য পতন হয়েছে।
প্রাথমিক পণ্যের মধ্যে হিমায়িত ও জীবন্ত মাছ রপ্তানি সামান্য বেড়েছে। ফল রপ্তানিতে ৮৭.১৬ শতাংশ, কাঁকড়া রপ্তানিতে প্রায় ৪৯ শতাংশ এবং সবজি রপ্তানিতে ৯.৫৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিপরীতে চিংড়ি, চা ও তামাক রপ্তানি কমেছে।
রপ্তানি বাজারের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গন্তব্য হিসেবে অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশটিতে রপ্তানি ৪.০৯ শতাংশ বেড়ে ৯.০৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। জার্মানিতে রপ্তানি ১০.৮১ শতাংশ কমলেও যুক্তরাজ্য, স্পেন, নেদারল্যান্ডস ও পোল্যান্ডে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এশিয়ার বাজারে চীনে রপ্তানি ১৮.২৪ শতাংশ বেড়েছে, তবে ভারত ও জাপানে রপ্তানি কমেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বাজারেও সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে যথাক্রমে ৯.৪১ শতাংশ ও ১৭.১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদায়ী অর্থবছরের সামগ্রিক রপ্তানি চিত্র একদিকে বৈশ্বিক বাজারের দুর্বলতার প্রতিফলন, অন্যদিকে নতুন বাজার ও অপ্রচলিত পণ্যে প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক ইঙ্গিতও বহন করছে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি প্রকৌশল, ওষুধ, চামড়া ও কৃষিপণ্য রপ্তানির বহুমুখীকরণ ত্বরান্বিত করা গেলে আগামী অর্থবছরে রপ্তানি আয় আবারও প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে পারে।













