ব্যাংক খাতে রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণের চাপ কমাতে এবং দীর্ঘদিন আটকে থাকা ঋণ আদায়ে বিশেষ ‘এক্সিট পলিসি’ চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এ নীতিমালার আওতায় আর্থিক সংকটে পড়লেও ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে—এমন খেলাপি ঋণগ্রহীতারা এককালীন অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ পাবেন। এ ক্ষেত্রে আরোপিত ও অনারোপিত সুদের উল্লেখযোগ্য অংশ মওকুফ করারও সুযোগ রাখা হয়েছে।
সোমবার এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত মন্দ ও ক্ষতিজনক মানে শ্রেণিকৃত (খেলাপি) ঋণ এই বিশেষ সুবিধার আওতায় আসবে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন এবং ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে এ সুবিধা দেওয়া যাবে।
নীতিমালার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ঋণগ্রহীতাকে এককালীন পুরো দায় পরিশোধ করতে হবে। এর বিনিময়ে ঋণের ওপর আরোপিত ও অনারোপিত সুদের একটি বড় অংশ মওকুফ করার সুযোগ থাকবে। একই সঙ্গে পূর্ববর্তী এক্সিট নীতিমালার কিছু কঠোর শর্তও শিথিল করা হয়েছে, যা খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তিকে আরও সহজ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সার্কুলারে আরও বলা হয়েছে, ৬ আগস্ট ২০২৪ থেকে ৩০ জুন ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে পুনঃতফসিল করা ঋণও এই বিশেষ সুবিধার আওতায় আসবে। বিশেষ করে কৃষি খাতের স্বল্পমেয়াদি ঋণ এবং সিএমএসএমই খাতের কটেজ, মাইক্রো ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ নিষ্পত্তিতে অগ্রাধিকার দিতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, বর্তমানে উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে উৎপাদনশীল খাতে প্রয়োজনীয় ঋণপ্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় আটকে থাকা ঋণ দ্রুত আদায় এবং কার্যকর ঋণ পুনর্বিন্যাসের লক্ষ্যে এক্সিট পলিসি চালু করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে ব্যাংকগুলোর দীর্ঘদিনের আটকে থাকা অর্থের একটি অংশ পুনরুদ্ধার হবে, অন্যদিকে প্রকৃত উদ্যোক্তারা ঋণের বোঝা কমিয়ে আবারও ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ পাবেন। এর ইতিবাচক প্রভাব বিনিয়োগ, উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানেও পড়তে পারে।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, নীতিমালাটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। প্রকৃত ব্যবসায়িক সংকটে পড়া ঋণগ্রহীতাদের জন্য এটি ইতিবাচক হলেও ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের একই ধরনের সুবিধা দেওয়া হলে ভবিষ্যতে নৈতিক ঝুঁকি (মোরাল হ্যাজার্ড) তৈরি হতে পারে। এতে নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী গ্রাহকদের মধ্যেও নেতিবাচক বার্তা যেতে পারে।
তাঁদের মতে, এক্সিট পলিসির সুবিধা দিতে হলে প্রতিটি ঋণগ্রহীতার আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসার সম্ভাবনা এবং খেলাপি হওয়ার কারণ পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে হবে।
সার্কুলার অনুযায়ী, এই বিশেষ এক্সিট সুবিধা আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এ সময়ের মধ্যে ব্যাংকগুলোকে যোগ্য ঋণগ্রহীতাদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ প্রান্তিক শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। দেশের ইতিহাসে এটিই সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের পরিমাণ। এই প্রেক্ষাপটে নতুন এক্সিট পলিসি ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধারে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, এখন সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।













