একটি শক্তিশালী ও টেকসই অর্থনীতি গড়ে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রধান উৎস হিসেবে দেশে একটি গভীর ও কার্যকর পুঁজিবাজার গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। সোমবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের সমাপনী বক্তব্যে তিনি দেশের পুঁজিবাজারকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং বিনিয়োগবান্ধব করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
পুঁজিবাজারের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে অর্থমন্ত্রী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অর্থ বিলে একগুচ্ছ বড় ধরনের কর সংশোধনী ও ছাড়ের প্রস্তাব এনেছেন। বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে এবং করের বোঝা কমাতে জিরো কুপন বন্ড থেকে প্রাপ্ত আয়কে সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখার আইনি প্রস্তাব করা হয়েছে।
শিল্পায়ন ও বিনিয়োগে দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের জোগান নিশ্চিত করতে ভালো কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আসতে বিশেষভাবে উৎসাহিত করছে সরকার। যেকোনো কোম্পানি শেয়ার হস্তান্তরপূর্বক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলেই কর হারে ২.৫ শতাংশ বিশেষ ছাড় পাবে। নতুন তালিকাভুক্তি বাড়াতে আইপিও, ডিরেক্ট লিস্টিং, রাইট ইস্যু অথবা আরপিও এর মাধ্যমে ন্যূনতম ১০ শতাংশ বা তার বেশি শেয়ার স্টক এক্সচেঞ্জে অফলোড করা হলে আরও ২.৫ শতাংশ কর হ্রাসের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এতে করে ভালো মানের কোম্পানিগুলো বাজারে আসতে আগ্রহী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তালিকাভুক্ত বা অতালিকাভুক্ত যেকোনো কোম্পানি তাদের সমস্ত লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলে সম্পন্ন করলে অতিরিক্ত ২.৫ শতাংশ কর সুবিধা পাবে। এর ফলে ক্যাশলেস লেনদেনকারী যেসব তালিকাভুক্ত কোম্পানি শেয়ার বাজারে ১০ শতাংশ বা বেশি শেয়ার অফলোড করেছে, তাদের কর হার অতালিকাভুক্ত কোম্পানির তুলনায় ৭.৫০ শতাংশ কম হবে।
পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ আয়ের ওপর করের হার বড় পরিসরে কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বা কোম্পানি করদাতাদের লভ্যাংশের ওপর প্রদেয় করের হার কমিয়ে ২০ শতাংশ এবং সাধারণ বা ব্যক্তি করদাতাদের লভ্যাংশ কর কমিয়ে ১৫ শতাংশ নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ক্ষুদ্র ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগের ওপর কর রেয়াত পাওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৫ লাখ টাকার বিনিয়োগ সীমা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যেকোনো অঙ্কের বিনিয়োগে কর রেয়াতের সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন. সরকারের অর্থায়ন কাঠামো পুনর্বিন্যাস করার অংশ হিসেবে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানসমূহকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে, সরকারের ওপর আর্থিক চাপ কমবে এবং প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে।
ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর বেসরকারি উদ্যোক্তাদের একক নির্ভরতা কমাতে পুঁজিবাজারে নতুন নতুন ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্ট্রুমেন্ট আনা হচ্ছে। বেসরকারি খাতের বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে বাজারে অ্যাসেট সিকিউরিটাইজেশন, বন্ড মার্কেট উন্নয়ন এবং ইক্যুইটি ফাইন্যান্সিংয়ের সরবরাহ বাড়ানো হবে।
আন্তর্জাতিক উৎস থেকে পুঁজি আকর্ষণের জন্য হংকং, লন্ডন ও নিউইয়র্কে কেবল বাংলাদেশে বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে বেসরকারি পর্যায়ে বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই তহবিলগুলো চালু হলে দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি না করেই সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের প্রকল্পে বড় বৈদেশিক বিনিয়োগ হিসেবে কাজ করবে।
সরকারের কাঠামোগত বিনিয়ন্ত্রণকরণ নীতির আওতায় ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)-কে পুনর্গঠন করা হয়েছে। পুঁজিবাজারের সামগ্রিক আইনি কাঠামো পর্যালোচনাপূর্বক সংস্কারের এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়া আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে।
অর্থনৈতিক মন্দা ও নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সরকারের এসব সংস্কারমুখী পদক্ষেপের কারণে ইতোমধ্যে পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে। অর্থমন্ত্রী জানান, বর্তমান বাজার সূচকের ধারাবাহিক উত্থানের মধ্য দিয়েই বিনিয়োগকারীদের এই আস্থার প্রতিফলন স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে।













