দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) খাতে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অনিয়ম, নজিরবিহীন কেলেঙ্কারি ও আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থতার অবসান ঘটাতে শেষ পর্যন্ত কঠোর আইনি অবসায়ন বা বন্ধের চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তীব্র সংকটে থাকা ৯টি অকার্যকর এনবিএফআইয়েঅবিলম্বে প্রশাসক বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা মূলত প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থায়ীভাবে বন্ধ বা অবসায়নের প্রথম আনুষ্ঠানিক ধাপ।
এসব প্রতিষ্ঠানের ভাগ্য নির্ধারণে মঙ্গলবার (৯ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে পরিচালনা পর্ষদের এক উচ্চপর্যায়ের জরুরি সভায় ৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে প্রশাসক বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, চূড়ান্তভাবে বন্ধ বা অবসায়নের তালিকায় থাকা ৫টি প্রতিষ্ঠান হলো—এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস।
অন্যদিকে বিআইএফসি, প্রিমিয়ার লিজিং, জিএসপি ফাইন্যান্স ও প্রাইম ফাইন্যান্সকে নিজেদের আর্থিক সক্ষমতা প্রমাণের জন্য আগামী তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত এই ৯০ দিনের মধ্যে যদি তারা সাধারণ আমানতকারীদের মূল অর্থ পরিশোধের ন্যূনতম সক্ষমতা দেখাতে ব্যর্থ হয়, তবে এই ৪টি প্রতিষ্ঠানকেও একই রেজল্যুশন বা অবসায়ন প্রক্রিয়ার আওতায় এনে স্থায়ীভাবে সিলগালা করে দেওয়া হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বন্ধের সিদ্ধান্ত হওয়া ৫টি ধসে পড়া প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে প্রায় ২৭ হাজার সাধারণ ব্যক্তি আমানতকারীর মোট ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার আমানত আটকে রয়েছে। অবসায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রথম কাজই হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা। এরপর একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর মতো এই এনবিএফআইগুলোতেও দ্রুত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে অভিজ্ঞ প্রশাসক নিয়োগ করা হবে। প্রশাসক দায়িত্ব গ্রহণের পর একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর অধীনে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া শুরু হবে, যেখানে প্রাথমিক ধাপে প্রত্যেক ব্যক্তি আমানতকারী সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত ফেরত পাবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন্ধ হতে যাওয়া এই ৫টি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ দেউলিয়া পরিস্থিতির চিত্র সামনে এসেছে। গত ডিসেম্বর শেষে এফএএস ফাইন্যান্সের মোট বিতরণকৃত ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে অবিশ্বাস্য ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। এছাড়া ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের খেলাপি ঋণ ৯৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ, ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৯৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, পিপলস লিজিংয়ের প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং আভিভা ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার ৯৩ দশমিক ৯৩ শতাংশে ঠেকেছে। এর অর্থ হলো, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আমানত হিসেবে নেওয়া শতভাগ টাকাই ঋণের নামে বের করে নিয়ে তা আর ফেরত আনা হয়নি।
খাতসংশ্লিষ্ট ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতাচ্যুত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক খলনায়ক ও বড় বড় মাফিয়া চক্রের নজিরবিহীন জালিয়াতি, লুটপাট ও স্বজনপ্রীতিমূলক ঋণ কেলেঙ্কারির কারণেই এই প্রতিষ্ঠানগুলো আজ সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে পড়েছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের সাবেক বিতর্কিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক পিকে হালদার, যিনি একক প্রভাবে এই তালিকার ৪টি এনবিএফআই থেকে জালিয়তির মাধ্যমে অন্তত সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা স্রেফ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচার করেছেন। বছরের পর বছর ধরে চলা এই প্রাতিষ্ঠানিক ডাকাতি এবং আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থতার দায়ে গত বছরের মে মাসেই ২০টি দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।
দেশের ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতটি গত কয়েক বছর ধরেই তীব্র তারল্য সংকট, প্রাতিষ্ঠানিক দেউলিয়াত্ব এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল তদারকির কারণে গভীর আস্থার সংকটে ভুগছিল, যার খেসারত হিসেবে হাজার হাজার আমানতকারীকে নিজেদের জমানো টাকা তুলতে এসে বছরের পর বছর ধরে চরম লাঞ্ছনা ও ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। এই ক্রান্তিকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নবগঠিত পরিচালনা পর্ষদ আর কোনো কালক্ষেপণ না করে আইনি রেজল্যুশন কাঠামোর আওতায় দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে ছেঁটে ফেলার এই যুগান্তকারী ও কঠোর সিদ্ধান্ত নিলো। এই সাহসী পদক্ষেপের মাধ্যমে একদিকে যেমন আমানতকারীদের টাকা আদায়ের পথ উন্মোচিত হলো, অন্যদিকে দেশের আর্থিক খাতে সুশাসন ও কঠোর শৃঙ্খলার এক নতুন বার্তা সঞ্চারিত হলো।













