বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ বা ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি’ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে যুক্তরাজ্যের মাটিতে প্রায় ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্পদ অবরুদ্ধ বা জব্দ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।
আজ সোমবার (৮ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকদের শীর্ষ সংগঠন ‘সম্পাদক পরিষদ’-এর নেতৃবৃন্দের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের সৌজন্য সাক্ষাতে এই তথ্য জানান গভর্নর।
সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ‘নিউ এজ’ সম্পাদক নুরুল কবীরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল এই বৈঠকে অংশ নেন, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই বৈঠকে দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের চলমান সংস্কার, আর্থিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্বল ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা, লাগামহীন খেলাপি ঋণ হ্রাস এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার আধুনিক ডিজিটাল রূপান্তরসহ সামষ্টিক আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার বিষয়ে অত্যন্ত খোলামেলা ও বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠকে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান দেশের ব্যাংকিং খাতকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীন রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, দেশের আর্থিক খাতের বর্তমান রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে এবং ঋণ বিতরণে শতভাগ পেশাদারিত্ব, জবাবদিহিতা ও করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চলমান সংস্কার কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য। আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিসহ দেশের বেশ কয়েকটি বৃহৎ সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন এবং ব্যবস্থাপনাগত বড় ধরনের পরিবর্তনের সুফলও তিনি সম্পাদকদের সামনে তুলে ধরেন।
দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা খেলাপি ঋণের মামলাগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করে ঋণ রিকভারি ফ্রেমওয়ার্ক শক্তিশালী করতে ‘অর্থঋণ আদালত আইন’ সংশোধন ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান গভর্নর। একই সাথে ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার করতে এবং কোনোভাবেই আদায় করা যাচ্ছে না এমন অকার্যকর ও অনাদায়ী ঋণগুলো আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তির লক্ষ্যে একটি নতুন ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি অ্যাক্ট’ (ডিএএমসিএ) প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দেশের দুর্বল ও সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর একীভূতকরণ (মার্জার) প্রক্রিয়ার সর্বশেষ অগ্রগতি নিয়ে গভর্নর জানান, প্রাতিষ্ঠানিক এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় ইতিমধ্যে বেশ কিছু বড় ধরনের প্রশাসনিক ও ব্যবস্থাপনাগত সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে। ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ ‘কোর ব্যাংকিং সিস্টেম’ (সিবিএস) পুরোপুরি উন্নয়ন এবং একটির সাথে অন্যটির ডিজিটাল সমন্বয় সম্পন্ন হওয়ার পর এই একীভূতকরণ ও শক্তিশালীকরণ কার্যক্রম আরও জ্যামিতিক গতি পাবে।
দেশের সামগ্রিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সমন্বিত ও সর্বাধুনিক ‘ডিজিটাল ফিন্যান্সিয়াল ইকোসিস্টেম’ গড়ে তুলতে কাজ করছে বলে বৈঠকে রূপরেখা দেন গভর্নর। এর অংশ হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-ভিত্তিক আধুনিক ঋণ মূল্যায়ন ব্যবস্থা, ডিজিটাল ন্যানো-লোন এবং নতুন লাইসেন্সপ্রাপ্ত ক্রেডিট ব্যুরোর মাধ্যমে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও সহজ করা হবে।
তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি মানুষকে এই ব্যবস্থার আওতায় আনতে ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডেন্টিটি, ওয়ান ওয়ালেট’ (এক নাগরিক, এক পরিচয়, এক ওয়ালেট) ধারণাটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করবে। এছাড়া ‘বাংলা কিউআর’-এর মাধ্যমে ক্যাশলেস লেনদেন নিশ্চিত করে প্রান্তিক অর্থনীতিকে রিপোর্টিং সিস্টেমের আওতায় আনা সম্ভব হলে দেশের সার্বিক রাজস্ব আদায় ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে।
জরুরি চিকিৎসায় বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার সুবিধা নিয়ে গভর্নর জানান, সাধারণ সীমার বাইরে গিয়ে বিদেশে চিকিৎসার জন্য বেশি ডলারের প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেই অনুমোদন দিয়ে দিচ্ছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্বস্তি ফেরাতে ‘ইউপাস এলসি’-র অধীনে বিল ডিসকাউন্টিংয়ের জন্য ব্যবহৃত ফান্ডের সুদহার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা হয়েছে। এই নীতিগত ছাড়ের কারণে দেশের বাজারে পণ্য আমদানি খরচ অনেক কমে আসবে, যা সরাসরি অভ্যন্তরীণ বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে।
সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় সভায় সম্পাদক পরিষদের সদস্যরা ব্যাংকিং খাতের টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে বিভিন্ন গঠনমূলক মতামত ও পরামর্শ দেন। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় এবং আর্থিক খাতের প্রকৃত তথ্য ও অগ্রগতি প্রকাশে উভয় পক্ষ আগামী দিনগুলোতেও পারস্পরিক পেশাদার সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে অংশ নেন দি ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, মানবজমিন সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, ইনকিলাব সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দীন এবং সমকাল সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী।













