দেশের শিল্প খাতকে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই করার লক্ষ্যে বড় ধরনের আর্থিক প্রণোদনা নিয়ে এসেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ডেলটা প্ল্যান ২১০০, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) এবং জাতীয় টেকসই অর্থায়ন নীতিমালার কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে এক হাজার কোটি টাকার একটি নতুন আবর্তনশীল পুনঃ অর্থায়ন তহবিল গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই তহবিলের আওতায় উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ সুদে দীর্ঘমেয়াদি মেয়াদি ঋণ সুবিধা পাবেন।
আজ সোমবার (৮ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘সাসটেইনেবল ফিন্যান্স ডিপার্টমেন্ট’ থেকে এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে দেশের সব তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
নতুন গঠিত এই ‘গ্রিন তহবিলের’ আওতায় ঋণ বিতরণ ও পরিশোধের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের বড় ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছে। পরিবেশবান্ধব কারখানা বা গ্রিন বিল্ডিং নির্মাণের জন্য এই তহবিল থেকে ঋণ নিলে গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ সুদের হার হবে ৫ শতাংশ। গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত কোনো লুকানো খরচ, ফি বা গোপন চার্জ আরোপ করা যাবে না। অন্যদিকে, অংশগ্রহণকারী ব্যাংক ও ফিন্যান্স কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে মাত্র ২ শতাংশ সুদে এই তহবিল থেকে পুনঃ অর্থায়ন সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে।
প্রজ্ঞাপনের শর্তানুযায়ী, এই পরিবেশবান্ধব ঋণের মেয়াদ হবে সর্বনিম্ন ৩ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছর। নতুন ব্যবসা গুছিয়ে নেওয়ার সুবিধার্থে উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত ‘গ্রেস পিরিয়ড’ বা কিস্তি পরিশোধের সাময়িক ছাড় পাবেন। কোনো একক উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠান এই তহবিলের আওতায় সর্বোচ্চ ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন। পরিবেশবান্ধব শিল্প তৈরি ও গ্রিন ফ্যাক্টরি ভবন নির্মাণের জন্য শুধু ‘মেয়াদি ঋণ’ হিসেবেই এই বিশেষ সুবিধা পাওয়া যাবে।
তবে এই গ্রিন ফান্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা ও শর্ত জুড়ে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কোনো ঋণখেলাপি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই তহবিল থেকে কোনোভাবেই ঋণ পাবেন না। ঋণ অনুমোদনের আগে ব্যাংকগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে গ্রাহকের হালনাগাদ সিআইবি রিপোর্ট পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করতে হবে।
এছাড়া প্রকল্পের মোট ব্যয়ের বিপরীতে ঋণ ও মূলধনের অনুপাত বা ডেট-ইকুইটি রেশিও ন্যূনতম ৭০:৩০ হতে হবে, অর্থাৎ প্রকল্পের মোট দায়ের অন্তত ৩০ শতাংশ উদ্যোক্তার নিজস্ব পকেটের মূলধন হতে হবে। এই ঋণের চূড়ান্ত আবেদন করার আগে আন্তর্জাতিক বা দেশীয়ভাবে স্বীকৃত গ্রিন রেটিং সংস্থা থেকে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের প্রামাণ্য সার্টিফিকেট বা প্রি-সার্টিফিকেট নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
তহবিল পরিচালনায় ব্যাংকগুলোর যোগ্যতার বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন নিয়মের রূপরেখা দিয়েছে। সব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও ফিন্যান্স কোম্পানি সরাসরি নতুন এ তহবিলের আওতায় ঋণ দিতে পারলেও বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকগুলোর জন্য খেলাপি ঋণের একটি সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। যেসব বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের কম, কেবল তারাই এই তহবিল থেকে অর্থ নিয়ে গ্রাহক পর্যায়ে বিতরণ করতে পারবে। তবে সামগ্রিক কার্যক্রম ভালো হলে বিশেষ ক্ষেত্রে এই সীমা ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শিথিল করার এখতিয়ার বাংলাদেশ ব্যাংকের থাকবে। এই সুবিধা দিতে আগ্রহী ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফিন্যান্স বিভাগের সঙ্গে একটি অংশগ্রহণ চুক্তি সই করতে হবে।
গ্রিন ফান্ডের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর তদারকির ব্যবস্থা রাখছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ঋণের টাকা সঠিক খাতে ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে বাংলাদেশ ব্যাংক যেকোনো সময় সরেজমিন প্রকল্প পরিদর্শন করতে পারবে। পরিদর্শনে যদি ঋণের কোনো অপব্যবহার বা ডাইভারশন প্রমাণিত হয়, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে জরিমানাসহ পুরো টাকা এককালীন ফেরত দিতে হবে। প্রচলিত ধারার ব্যাংকের পাশাপাশি শরিয়াহভিত্তিক পরিচালিত ইসলামী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও নিজস্ব নিয়মে ও বিনিয়োগ পদ্ধতিতে গ্রাহকদের এই গ্রিন ফান্ড থেকে অর্থায়ন সুবিধা দিতে পারবে।













