টানা চার বছরের কৃত্রিম বন্দিদশা কাটিয়ে দেশের পুঁজিবাজার অবশেষে সম্পূর্ণভাবে ফ্লোর প্রাইস বা শেয়ারের দামের সর্বনিম্ন সীমার বৈকল্য থেকে মুক্ত হতে যাচ্ছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) তালিকাভুক্ত অবশিষ্ট দুই বিতর্কিত কোম্পানি—বেক্সিমকো লিমিটেড ও ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-র ওপর থাকা ফ্লোর প্রাইসের কড়াকড়ি আজ সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নিয়েছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। আজ ৮ জুন লেনদেন শেষে কমিশনের এক বিশেষ সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর এ সংক্রান্ত জরুরি আদেশ জারি করা হয়।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই নতুন নির্দেশনার ফলে আগামীকাল মঙ্গলবার (৯ জুন) থেকে কোম্পানি দুটির শেয়ার সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে এবং কোনো প্রকার কৃত্রিম মূল্যস্তর ছাড়াই লেনদেন করতে পারবে। বিএসইসির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মাসুদ খানের নেতৃত্বে নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর গত বৃহস্পতিবারই সংবাদ সম্মেলনে এই ফ্লোর প্রাইস চিরতরে তুলে নেওয়ার একটি নীতিগত ঘোষণা দিয়েছিলেন। এমনকি পুঁজিবাজারে ভবিষ্যতে আর কখনোই এই ধরনের কৃত্রিম ও অকার্যকর ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হবে না বলেও তিনি বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করেন, যার ধারাবাহিকতায় আজ এই চূড়ান্ত আদেশ জারি হলো।
পুঁজিবাজারের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, করোনা মহামারি এবং পরবর্তীতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় বাজারে টানা ধস ঠেকাতে ২০২০ সালের মার্চে প্রথমবার এবং পরবর্তীতে ২০২২ সালের ২৮ জুলাই দ্বিতীয় দফায় এই ফ্লোর প্রাইস বা সর্বনিম্ন মূল্যসীমা বেঁধে দিয়েছিল তৎকালীন কমিশন। সূচকের পতন ঠেকাতে সাময়িক স্বস্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে এই কৃত্রিম ব্যবস্থা বাজারের স্বাভাবিক মূল্য আবিষ্কার এবং তারল্য প্রবাহকে মারাত্মকভাবে অবরুদ্ধ করে ফেলে, যার ফলে হাজার হাজার বিনিয়োগকারী তাদের শেয়ার বিক্রি করতে না পেরে মূলধন সংকটে পড়েন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে তৎকালীন কমিশন ধাপে ধাপে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার শুরু করে এবং একই বছরের আগস্টের মধ্যে অধিকাংশ কোম্পানির ওপর থেকে এই বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়। তবে সূচকে বড় প্রভাব ফেলার অজুহাতে বেক্সিমকো ও ইসলামী ব্যাংককে দীর্ঘ সময় ধরে এই নিয়মের বেড়াজালে আটকে রাখা হয়েছিল। দীর্ঘ অপেক্ষার পর আজ এই শেষ দুটি কোম্পানির শেয়ারও মুক্ত হলো, যার মাধ্যমে ২০২২ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া একটি বিতর্কিত অধ্যায়ের পুরোপুরি অবসান ঘটল।
আজ সোমবারের লেনদেন চিত্র অনুযায়ী, ফ্লোর প্রাইসের সর্বশেষ দিনেও কোম্পানি দুটির শেয়ারের দাম সর্বনিম্ন স্তরেই থমকে ছিল, যেখানে বেক্সিমকোর প্রতিটি শেয়ার ১১০ টাকা ১০ পয়সায় এবং ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার ৩২ টাকা ৬০ পয়সায় স্থির ছিল। আগামীকাল থেকে এই দুই শেয়ারের ক্ষেত্রেও বিএসইসির ২০২১ সালের জুন মাসের সাধারণ সার্কিট ব্রেকার বা মূল্য পরিবর্তনের স্বাভাবিক আন্তর্জাতিক নিয়ম কার্যকর হবে, যা বাজারের সার্বিক লজিস্টিকস ও লেনদেনের গতিকে আরও বেগবান করবে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
৯৪৩ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের বেক্সিমকো লিমিটেডের ৩৩.১১ শতাংশ শেয়ার রয়েছে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে। প্রতিষ্ঠানটির বিতর্কিত উদ্যোক্তা সালমান এফ রহমান বর্তমানে ব্যাংক ঋণ আত্মসাৎসহ নানা অভিযোগে কারাগারে আছেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বেক্সিমকো লিমিটেড বর্তমানে বিপুল লোকসানে রয়েছে। আর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক ঋণ লুট করা এস আলম বিদেশে পালিয়ে আছেন। এস আলম গ্রুপের বিভিন্ন কোম্পানির নামে ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৮২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে, যা বর্তমানে আদালত ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) অবস্থায় রয়েছে।













