১০ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ২২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে

ডিএসজে
ডিএসজে আর্কাইভ

চলমান মার্কিন-ইরান যুদ্ধের জেরে বিশ্বব্যাপী তৈরি হওয়া তীব্র জ্বালানি সংকট ও পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর। এর ফলে আমদানিতে বিপুল খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের বাণিজ্য ঘাটতি এক আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২.২ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত ব্যালেন্স অব পেমেন্ট বা বিওপি সংক্রান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য মিলেছে। চলতি অর্থবছরের এপ্রিল মাসে মাত্র ৩০ দিনের ব্যবধানে দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ৩০৪ কোটি বা ৩.০৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বৈশ্বিক এই সংকটের কারণে দেশে পণ্য আমদানির ব্যয় যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, সেই তুলনায় পণ্য রপ্তানি থেকে আয় আশানুরূপভাবে বাড়ছে না। এই চরম অসমতার কারণে ধারাবাহিকভাবে বড় হচ্ছে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ব্যবধান। এর আগের মাস মার্চে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছিল ২২৫ কোটি বা ২ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার। অথচ এপ্রিল মাসেই সেই ঘাটতির গতি আরও তীব্র হয়ে মাত্র এক মাসেই তা ৩০০ কোটি ডলারের ঘর অতিক্রম করল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে অর্থাৎ জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে দেশের পুঞ্জীভূত বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৯১৭ কোটি ৩ লাখ ডলার। তবে এপ্রিল মাসের বড় ধাক্কায় অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে অর্থাৎ জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে দেশের সার্বিক বাণিজ্য ঘাটতি এক লাফে ২ হাজার ২২১ কোটি বা ২২.২১ বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকেছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে বাংলাদেশ থেকে বিশ্ববাজারে পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে ৩ হাজার ৬০১ কোটি ৬ লাখ ডলারের। এর বিপরীতে একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে পণ্য আমদানি বাবদ ব্যয় করতে হয়েছে ৫ হাজার ৮২২ কোটি ৫ লাখ ডলার। এর ফলে রপ্তানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় বেশি হওয়ায় সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২২০ কোটি ৯ লাখ ডলার।

বাণিজ্য ঘাটতির এই ধারাবাহিক অবনতির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের চলতি হিসাবেও (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট)। অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে দেশের চলতি হিসাবের ঘাটতি যেখানে ছিল ৫৮ কোটি ৬ লাখ ডলার, সেখানে প্রথম দশ মাস শেষে এই ঘাটতির পরিমাণ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে ১০৭ কোটি ৩ লাখ ডলারে। সেই হিসাবে এপ্রিল মাসে মাত্র এক মেয়াদে চলতি হিসাবের ঘাটতি বেড়েছে ৪৮ কোটি ৭ লাখ ডলার। সাধারণত পণ্য ও সেবার নিট বাণিজ্য, প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এবং বিদেশ থেকে আসা বিভিন্ন চলতি হস্তান্তর এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত থাকে, যা দেশের অর্থনীতির দৈনন্দিন লেনদেনের প্রকৃত সুরক্ষাকবচ।

তবে বৈদেশিক লেনদেনের এই চরম সংকটের মধ্যেও স্বস্তি দিচ্ছে দেশের আর্থিক হিসাব (ফাইনান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট) ও ট্রেড ক্রেডিট খাতের ইতিবাচক প্রবাহ। অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্তের পরিমাণ যেখানে ছিল ৩৫৫ কোটি ৩ লাখ ডলার, প্রথম দশ মাস শেষে তা আরও বেড়ে ৪৪৭ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে।

একইভাবে পণ্য বা পরিষেবা এখনই গ্রহণ করে পরে মূল্য পরিশোধের স্বল্পমেয়াদি মূলধন প্রবাহ বা ট্রেড ক্রেডিটেও উদ্বৃত্তের ধারাবাহিকতা বজায় রয়েছে। জুলাই-মার্চ সময়ে ট্রেড ক্রেডিটে উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ৩২২ কোটি ৭ লাখ ডলার, যা এপ্রিল মাস শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫৭ কোটি ১ লাখ ডলারে। সরাসরি পণ্য আমদানির সঙ্গে অর্থায়নের সম্পর্ক স্থাপন করায় এটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কমাতে ভূমিকা রাখছে।

আমদানি ও চলতি হিসাবের বড় ধাক্কার পরও আর্থিক হিসাব ও ট্রেড ক্রেডিটের এই শক্তিশালী প্রত্যাবর্তনের কারণে দেশের সার্বিক লেনদেনের ভারসাম্যে (ওভারঅল ব্যালেন্স) এক ধরনের উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে দেশের সার্বিক লেনদেনের ভারসাম্যে যেখানে ৩৬৭ কোটি ২ লাখ ডলার উদ্বৃত্ত ছিল, প্রথম দশ মাস শেষে সেই উদ্বৃত্তের পরিমাণ সামান্য বেড়ে ৩৭৪ কোটি ১ লাখ ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা এই ভূ-রাজনৈতিক ক্রান্তিকালেও দেশের বাহ্যিক অর্থনীতিকে কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top