হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি স্থানান্তরের মূল উদ্দেশ্য ছিল বুড়িগঙ্গাকে দূর্ষণমুক্ত করা এবং বৈশ্বিক কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করা। তবে এক দশকেও সাভার চামড়াশিল্প নগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) সহ পরিবেশগত ও অবকাঠামোগত সুবিধা সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা হারিয়েছে বাংলাদেশ। এর ফলে এক সময়ের অমিত সম্ভাবনাময় এই খাতের ভবিষ্যৎ দিন দিন ফিকে হয়ে আসছে, যার ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী—উভয় নদীতেই। দেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম প্রধান এই খাতকে বাঁচাতে হলে পরিবেশগত মান-অনুবর্তিতা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সমন্বিত ও বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
শনিবার (৬ জুন) পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) আয়োজিত নীতিনির্ভর আলোচনা ধারাবাহিক ‘আজকের এজেন্ডা’-এর অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত “বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের ভবিষ্যৎ কি ফিকে হয়ে আসছে?” শীর্ষক এক নীতিনির্ধারণী সংলাপে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, ট্যানারি মালিক ও খাতের প্রতিনিধিরা এই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেন। পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
সংলাপের শুরুতেই সাভার চামড়াশিল্প নগরীর চরম অবকাঠামোগত ও পরিবেশগত অব্যবস্থাপনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) চেয়ারম্যান মো. টিপু সুলতান। তিনি বলেন, “হাজারীবাগ থেকে হেমায়েতপুরে স্থানান্তরের মূল কারণ ছিল পরিবেশগত সুবিধা নিশ্চিত করা। কিন্তু আজও আমরা সেই সুবিধা পাইনি। এর ফলে আমরা বৈশ্বিক ক্রেতা হারিয়েছি। আমাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ছোট শিল্পও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এতে ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তাদের উৎপাদন সম্প্রসারণ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।”
অবকাঠামোগত সংকটের বাইরে দেশের সামগ্রিক ত্রুটিপূর্ণ ব্যবসায়িক পরিবেশ ও নীতিমালার কঠোর সমালোচনা করেন জেনি শুজের চেয়ারম্যান নাসির খান। তিনি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতের ৪টি প্রধান প্রতিবন্ধকতা—জটিল লাইসেন্সিং ব্যবস্থা, কর-সংক্রান্ত হয়রানি, অকার্যকর প্রণোদনা কাঠামো এবং সীমিত মূল্য সংযোজনের কথা উল্লেখ করেন। ভিয়েতনামের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে এবং রপ্তানি আয় বাড়াতে প্রয়োজনীয় নীতিগত কাঠামো ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ বাংলাদেশ এখনো গড়ে তুলতে পারেনি।
করব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, “আমাদের দেশের করব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে উঠেছে যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যাপ্ত মুনাফা না করলে এখানে টিকে থাকতে পারে না। এ কারণেই ইউনিকলোকে বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছে।”
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করে বলেন, একসময় বাংলাদেশের চামড়াশিল্পকে ঘিরে যে বিপুল সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিল, তা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার কারণে ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (সিবিএএম)-এর সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে বলেন, “বাংলাদেশকে সিবিএএমের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। নতুন বৈশ্বিক পরিবেশগত মান পূরণে ব্যর্থ হলে আমাদের রপ্তানি পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”
অন্যদিকে দেশীয় মূল্যশৃঙ্খলে চামড়া সংরক্ষণ ও সংরক্ষণ-পরবর্তী ব্যবস্থাপনার ব্যাপক দুর্বলতার কথা তুলে ধরেন অধ্যাপক আব্দুস সাত্তার মন্ডল। তিনি বলেন, সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া নষ্ট হচ্ছে। তিনি আগামী এক বছরের মধ্যে চামড়ার অপচয় অন্তত ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার একটি জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ এবং ক্ষয়ক্ষতির উৎস চিহ্নিত করার ওপর জোর দিয়ে বলেন, “আগামী এক বছরের মধ্যে আমাদের অন্তত ৫০ শতাংশ চামড়ার অপচয় কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত এবং কোথায় ক্ষতি হচ্ছে তা দ্রুত শনাক্ত করতে হবে।”
চামড়ার এই অপচয় রোধে সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. নুরুল আমিন। তিনি বলেন, কাঁচা চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং সঠিক ব্যবস্থাপনায় সরকারের মাঠ পর্যায়ে আরও সক্রিয় ও নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা প্রয়োজন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “সরকারের সহায়তায় আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যাতে দেশের কোনো অঞ্চলে একটি চামড়াও অপচয় না হয়।”
আলোচকদের মাঝে মোছাদ্দেকুল হক কোরবানি ঈদের পর দেশের বিভিন্ন এলাকায়, এমনকি ঢাকার অভিজাত এলাকাগুলোতেও অসচেতনতার কারণে রাস্তার পাশে চামড়া ফেলে রাখার প্রবণতার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “চামড়ার গুণগত মান বজায় রাখতে এবং অপ্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ক্ষতি এড়াতে জবাইয়ের সঙ্গে সঙ্গেই চামড়ায় লবণ প্রয়োগ করতে হবে।” এতে চামড়া পচে যাওয়া রোধের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে এর কাঁচামালের ভালো মূল্য ধরে রাখা সম্ভব হবে।
আলোচনার সমাপনী বক্তব্যে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এই নীতি-আলোচনাকে একটি চোখ খুলে দেওয়ার মতো জাতীয় সংলাপ হিসেবে উল্লেখ করেন। চামড়াশিল্পের ভবিষ্যৎ পুনরুজ্জীবনে একক কোনো চিন্তা না করে আরও সমন্বিত ও বহুমাত্রিক চিন্তার আহ্বান জানান তিনি। ড. রহমান আক্ষেপ করে বলেন, হাজারীবাগ থেকে হেমায়েতপুরে ট্যানারি স্থানান্তরের মূল উদ্দেশ্য ছিল বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানো, কিন্তু দূষণের সেই ভয়াবহ প্রভাব আজও বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী—উভয় নদীতেই দৃশ্যমান রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “আমাদের একমাত্রিক সৎ উদ্দেশ্য শেষ পর্যন্ত সব সময় ভালো ফল বয়ে আনবে—এমনটি নাও হতে পারে।” পরিবেশ, অর্থনীতি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পখাতের পারস্পরিক চতুর্মুখী সম্পর্ক বিবেচনায় নিয়েই টেকসই ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নির্ধারণ করতে হবে।











