ব্যাংক খাতে ২ লাখ কোটি টাকার রেকর্ড প্রভিশন ঘাটতি

Web Photo Card June 4 2026 BB
ডিএসজে

দেশের ব্যাংকিং খাতের ভেতরের আর্থিক ভিত্তি ও নিরাপত্তা দেওয়াল কতটা নড়বড়ে এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে, তার এক চরম উদ্বেগজনক চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। বছরের প্রথম প্রান্তিক (জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬) শেষে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের রেকর্ড উল্লম্ফনের পাশাপাশি খেলাপি ঋণের বিপরীতে রাখা নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২ লাখ কোটি টাকার মহাসংকট পার করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের ‘৩১ মার্চ ২০২৬ স্থিতি ভিত্তিক শ্রেণিকৃত ঋণ ও প্রভিশন সংক্রান্ত প্রতিবেদন’ বিশদ বিশ্লেষণ করে এই ভয়াবহ তথ্য পাওয়া গেছে।

আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রভিশন হলো ব্যাংকের মুনাফার একটি অংশ যা খেলাপি ঋণের ঝুঁকি সামলাতে আলাদা করে রাখতে হয়। ২ লাখ কোটি টাকার এই বিশাল ঘাটতি প্রমাণ করে যে, ব্যাংকগুলো কাগজে-কলমে যে মুনাফা দেখাচ্ছে তার বড় অংশই ভুয়া। এই বিপুল পরিমাণ প্রভিশন ঘাটতি দেশের ব্যাংকিং খাতের মূলধন পর্যাপ্ততা ও আন্তর্জাতিক মানের রেটিংকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মার্চ প্রান্তিক শেষে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকে মোট প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। বিগত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিকে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৯১ হাজার ৪৪১ কোটি টাকা। অর্থাৎ, মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে পুরো ব্যাংকিং খাতে নতুন করে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে ১৪ হাজার ২২৩ কোটি টাকা। এর ফলে আমানতকারীদের অর্থের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর যে আপৎকালীন আর্থিক সুরক্ষা রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা রক্ষায় ব্যাংকগুলো চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছরের ৩১ মার্চ তারিখে ব্যাংকগুলোর মোট রক্ষিতব্য প্রভিশনের (যা রাখার কথা ছিল) পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৬১ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা। কিন্তু এর বিপরীতে দেশের ব্যাংকগুলো রাখতে সক্ষম হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৫৬ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। গত তিন মাসে ব্যাংকগুলোর রক্ষিতব্য প্রভিশন ২০ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা বাড়লেও ব্যাংকগুলোর প্রভিশন রাখার সক্ষমতা বেড়েছে মাত্র ৬ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা। এর ফলে প্রভিশন কভারেজ অনুপাত বা নিরাপত্তা সঞ্চিতির সামর্থ্য গত ডিসেম্বরের ৫৬.৬০ শতাংশ থেকে কমে মার্চে ৫৫.৪৬ শতাংশে নেমে এসেছে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রভিশন ঘাটতির মূল দায় বহন করছে দেশের বেসরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে ৪৩টি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মোট রক্ষিতব্য প্রভিশন ছিল ৩ লাখ ৪২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা, যার বিপরীতে তারা রাখতে পেরেছে মাত্র ২ লাখ ১১, হাজার ৩৯ কোটি টাকা। এর ফলে কেবল বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতেই প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৩১ হাজার ৩১০ কোটি টাকা।

অন্যদিকে, ৬টি রাষ্ট্র-মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রভিশন পরিস্থিতিও চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। সরকারি ব্যাংকগুলোর মোট রক্ষিতব্য প্রভিশন ১ লাখ ৩ হাজার ৩৩৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকার বিপরীতে রক্ষিত প্রভিশনের পরিমাণ মাত্র ২৮ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭৪ হাজার ৪৭১ কোটি টাকা। ৩টি বিশেষায়িত ব্যাংকেও প্রভিশন ঘাটতি রয়েছে ২২২ কোটি টাকা। তবে ব্যতিক্রম হিসেবে কেবল ৯টি বিদেশী ব্যাংক তাদের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি প্রভিশন রেখে প্রায় ৩৩৯ কোটি টাকার ‘প্রভিশন উদ্বৃত্ত’ ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top