সিইটিপি যেভাবে পুরো চামড়া শিল্পের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে

DSJ Web Photo May 24 2026 BangladeshEconomy⁠
প্রতীকী ছবি

সাভারের হেমায়েতপুরে চামড়া শিল্পনগরী স্থানান্তরের এক দশক পেরিয়ে গেলেও কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) পূর্ণাঙ্গ ও আন্তর্জাতিক মানে কার্যকর না হওয়ায় বাংলাদেশের পুরো ট্যানারি খাত আজ এক ভয়াবহ ও বহুমুখী অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স ও পরিবেশগত ছাড়পত্রের মূল চালিকাশক্তি এই সিইটিপির কারিগরি সক্ষমতার চরম অভাবের কারণে দেশীয় চামড়া বিশ্ববাজারে তার ন্যায্য মূল্য ও ক্রেতা দুই-ই হারাচ্ছে, যার নেতিবাচক চেইন-ইফেক্ট সরাসরি সামাজিকভাবে প্রান্তিক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর গিয়ে পড়ছে।

বিশ্বের শীর্ষ ২০টি পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানার মধ্যে ১৮টি এবং দেশে বর্তমানে ২৩০টি গ্রিন গার্মেন্টস থাকার সুবাদে বাংলাদেশ বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় শীর্ষস্থান ধরে রাখলেও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি সম্ভাবনাযুক্ত চামড়াশিল্পে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র। চামড়াশিল্পের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো ইউরোপভিত্তিক লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের পরিবেশগত সনদ (এলডব্লিউজি), যা বিশ্বজুড়ে আড়াই হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান পেলেও বাংলাদেশে এই সংখ্যা মাত্র ৮টি।

সাভারের সিইটিপির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে অধিকাংশ ট্যানারি এলডব্লিউজি সনদ পাচ্ছে না। ২০২৩ সালে এলডব্লিউজি স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে সিইটিপির সমস্যার কারণে সাভারের কোনো ট্যানারিই আন্তর্জাতিক অডিটের জন্য যোগ্য বিবেচিত হবে না।

বর্তমানে সাভারের সিইটিপির ঘোষিত বর্জ্য শোধন সক্ষমতা দৈনিক ২৫ হাজার ঘনমিটার হলেও এর প্রকৃত কার্যকর সক্ষমতা মাত্র ১৫ হাজার ঘনমিটারের কাছাকাছি, যেখানে ট্যানারিগুলো পূর্ণ উৎপাদনে গেলে দৈনিক বর্জ্য উৎপাদন হয় ৪০ হাজার ঘনমিটারের বেশি। এই বিশাল কারিগরি ঘাটতির কারণে আন্তর্জাতিক পরিবেশগত মান বজায় রাখা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।

এমন পরিস্থিতিতে দেশের দ্বিতীয় শীর্ষ রপ্তানি খাত হয়েও তৈরি পোশাকের তুলনায় চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি এক বিলিয়ন ডলারের ঘরেই রয়ে গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তৈরি পোশাকের রপ্তানি আয় ছিল ৩৯.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, সেখানে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি ছিল মাত্র ১.১৪ বিলিয়ন ডলার। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে এ খাতের রপ্তানি আয় সামান্য বেড়ে ৯৮৮ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৫ শতাংশ বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক মো. আবু ইউসুফ বলেন, সাভারের অন্তত ১৫ থেকে ১৬টি ট্যানারি নিজস্বভাবে আন্তর্জাতিক মানের হলেও শুধু সিইটিপির দুর্বলতার কারণে তারা এলডব্লিউজি সনদ পাচ্ছে না, যা দেশের চামড়ার চাহিদা ও দাম দুটোই কমিয়ে দিচ্ছে।

সনদ সংকটে আমদানি নির্ভরতা ও একচেটিয়া চীন বাজার
সাভারের সিইটিপি পূর্ণাঙ্গরূপে কার্যকর না থাকার সবচেয়ে বড় মাশুল দিচ্ছে দেশের পাদুকা ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি খাত। বৈশ্বিক বাজারে শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর কাছে জুতো রপ্তানির পূর্বশর্ত হলো এলডব্লিউজি সার্টিফাইড চামড়া ব্যবহার করা। দেশীয় ট্যানারিগুলো এই সনদ না পাওয়ায় নিজস্ব কাঁচামালের ব্যাপক প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও দেশের জুতা ও চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্য হয়ে চীন, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে চামড়া আমদানি করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ২ হাজার ৯ কোটি টাকার চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য আমদানি হয়েছে, যা আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ১ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকার তুলনায় অনেক বেশি। এমনকি চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই (ডিসেম্বর পর্যন্ত) আমদানি হয়েছে ১ হাজার ২২০ কোটি টাকার চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য। দেশের ভেতরে কোটি কোটি পিস কাঁচা চামড়া থাকার পরও বৈশ্বিক ছাড়পত্র না থাকায় বিদেশ থেকে চামড়া আমদানি করতে হচ্ছে, যা দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার অপচয় ঘটাচ্ছে এবং দেশীয় ট্যানারিগুলোকে নিজস্ব বাজারেই পঙ্গু করে দিচ্ছে।

এলডব্লিউজি সনদ না থাকার কারণেই ইউরোপ ও আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় এবং উচ্চমূল্যের ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ থেকে সরাসরি চামড়া কেনা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের প্রক্রিয়াজাত চামড়ার রপ্তানি বাজার এখন সম্পূর্ণভাবে একচেটিয়া ‘চীননির্ভর’ হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চীনা ক্রেতারা অনেক ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট করে সমন্বিতভাবে দাম নির্ধারণ করে দেয়, যার ফলে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের দর-কষাকষির কোনো সুযোগ থাকে না। যেমন—চট্টগ্রামভিত্তিক রিফ লেদার নিজস্ব অর্থায়নে ৫.৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ইটিপি স্থাপন করে এলডব্লিউজি সনদ পাওয়ায় ইতালি, স্পেন, জাপান, ভিয়েতনাম ও তাইওয়ানে প্রতি বর্গফুট চামড়া প্রায় দেড় ডলারে রপ্তানি করতে পারছে। অথচ সাভারের ট্যানারিগুলো আন্তর্জাতিক ক্রেতা না পেয়ে একই মানের চামড়া মাত্র ৫০ থেকে ৭০ সেন্টে চীনের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে।

এই বাজার সংকটের কারণে অনেক ঐতিহ্যবাহী ট্যানারির ব্যবসা ধসে পড়েছে; যেমন—সদর ট্যানারির ব্যবসা ক্রেতা হারানোর ফলে প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে। বিদেশি ক্রেতাদের ধরে রাখতে ব্যবসায়ীরা নিজস্ব উদ্যোগে বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণে বাধ্য হচ্ছেন। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এ খাতের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান অ্যাপেক্স ট্যানারি লিমিটেডের সাম্প্রতিক বার্ষিক ও প্রান্তিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে এই সংকটের করপোরেট ক্ষত স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেখানে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে অ্যাপেক্স ট্যানারির শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৫.৫৬ টাকায়, যা আগের বছরের একই সময়ের ১২.৪৬ টাকার চেয়েও বেশি। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো দামে চামড়া বিক্রি করতে না পারার কারণেই কোম্পানিটির পরিচালন আয় তলানিতে ঠেকেছে।

মূল্য অসঙ্গতি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বঞ্চনা
ট্যানারিগুলোর এই ধারাবাহিক লোকসান ও আন্তর্জাতিক বাজারে দর-কষাকষির ক্ষমতা হারানোর সবচেয়ে মারাত্মক সামাজিক প্রভাব পড়ছে প্রতি বছর পবিত্র ঈদুল আজহার কোরবানিকে কেন্দ্র করে। ট্যানারি মালিকদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে মন্দার কারণে সরকার নির্ধারিত দামে চামড়া কিনে লাভ করা অসম্ভব। বর্তমানে বিশ্ববাজারে ভালো মানের চামড়া প্রতি বর্গফুট ৫০ থেকে ৬০ সেন্ট এবং মাঝারি মানের চামড়া ৪০ থেকে ৪৫ সেন্টে বিক্রি হলেও সরকার ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬০ থেকে ৬৫ টাকা নির্ধারণ করেছে।

এই মূল্যের অসঙ্গতি ও সিইটিপির সক্ষমতার অভাবে কোরবানির সময় বাজারে কাঁচা চামড়ার দামের মহাবিপর্যয় ঘটে, যার ফলে দেশের সাধারণ মানুষ উচ্চ মূল্যে কোরবানির পশু কিনলেও তা ফেয়ার প্রাইসে বিক্রি করতে পারছে না। ধর্মীয় ও আইনি বিধান অনুযায়ী পশুর চামড়া বিক্রির যে অর্থ সরাসরি সমাজের এতিম, मिसকিন ও দরিদ্র মানুষের হক, ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার কারণে দেশের সেই সুবিধাবঞ্চিত কোটি কোটি গরিব মানুষ তাদের এই পাওনা থেকে চরমভাবে বঞ্চিত হচ্ছে।

তবে আশার কথা এই যে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সীমান্ত পাহারার দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর কঠোর নজরদারি এবং টহল ব্যবস্থার কারণে সীমান্ত দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে কাঁচা চামড়া পাচার হওয়ার ঐতিহাসিক প্রবণতা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। পাচার রোধের এই সাফল্য দেশের কাঁচা চামড়াকে দেশের ভেতরে ধরে রাখতে সাহায্য করলেও, সাভারের সিইটিপির অভ্যন্তরীণ বর্জ্য শোধনের অক্ষমতার কারণে সেই চামড়ার সঠিক অর্থনৈতিক মূল্য বা ভ্যালু এডিশন করা সম্ভব হচ্ছে না।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) তথ্য অনুযায়ী, দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের অভ্যন্তরীণ বাজারের আকার বা মার্কেট সাইজ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার বা সাড়ে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এ খাতে সাড়ে তিন হাজারের বেশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান, ২৫০টির বেশি ট্যানারি এবং প্রায় ৯০টি বড় চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যা সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ৮ থেকে ১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে। অন্যদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশ থেকে ১৪ হাজার ৪৭১ কোটি টাকার চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে, এবং চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত রপ্তানি হয়েছে ৭ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকার পণ্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই খাতের বিশাল রপ্তানি সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তুলতে হলে সাভারের সিইটিপির কার্যকর সক্ষমতা বৃদ্ধি, নতুন আধুনিক ইটিপি স্থাপন, আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতকরণ এবং চামড়া খাতের টেকসই উন্নয়ন ও তদারকির জন্য একটি স্বাধীন ও বিশেষায়িত ‘পৃথক চামড়া উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ গঠন করা এখন সময়ের দাবি।

বিসিকের বর্তমান চেয়ারম্যান জানিয়েছেন যে, সিইটিপির সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং নতুন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব ইটিপি স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগ দ্রুত ও সময়োপযোগীরূপে বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক সনদ পাওয়ার পথ সহজ হবে এবং দেশের চামড়াশিল্প আবারও বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে ফিরতে পারবে।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top