তীব্র সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকট, মেগা রাজস্ব ঘাটতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের টানাপোড়েনের এই ক্রান্তিকালে বাংলাদেশের উন্নয়ন রূপরেখায় এক বিশাল ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক জোগানের ঘোষণা দিয়েছে অন্যতম প্রধান বৈশ্বিক অংশীদার এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। আগামী পাঁচ বছরে ‘দেশব্যাপী সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প’ বা ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের আওতায় বাংলাদেশকে ৫০০ কোটি (৫ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের এক বিশাল তহবিল দেওয়ার আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সংস্থাটি।
একই সাথে মধ্যমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য বার্ষিক ঋণের বরাদ্দ বা সার্বভৌম প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ২০ শতাংশ বাড়িয়ে বার্ষিক ২.৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার মেগা ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা এলডিসি উত্তরণ ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সরকারের হাতকে শক্তিশালী করবে।
সোমবার (২৫ মে) ঢাকায় সফররত এডিবির প্রেসিডেন্ট মাসাতো কান্দা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে এক বিশেষ ও উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন। ওই বৈঠকেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক সংযোগ বাড়াতে এই বিশাল অর্থায়নের রূপরেখা ও নীতিগত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়। বৈঠক শেষে এডিবির ম্যানিলা সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই মেগা ফান্ডিংয়ের বিস্তারিত বিবরণ জনসমক্ষে আনা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠককালে এডিবির প্রেসিডেন্ট মাসাতো কান্দা বাংলাদেশের চলমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্রান্তিকালীন সংস্কারের প্রশংসা করে বলেন, “বাংলাদেশ বর্তমানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং নতুন নীতিগত ধাপে প্রবেশ করছে। এই রূপান্তরকালীন সময়ে দেশের কষ্টার্জিত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে, প্রবৃদ্ধির নতুন উৎসগুলোর দুয়ার উন্মোচন করতে এবং নাগরিকদের জন্য উন্নত কর্মসংস্থান ও ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি করে একটি বহুমুখী ও স্থিতিস্থাপক অর্থনীতি গড়ে তুলতে এডিবি বাংলাদেশের পাশে দৃঢ়ভাবে অবস্থান করবে।”
এডিবির এই নতুন মেগা প্যাকেজের আওতায় প্রতি বছর গড়ে ১০০ কোটি ডলার করে আগামী ৫ বছরে মোট ৫০০ কোটি ডলার দেওয়া হবে, যা মূলত এডিবির বর্ধিত বার্ষিক সার্বভৌম প্রতিশ্রুতির সাথে কৌশলগতভাবে যুক্ত থাকবে। এই কর্মসূচির লক্ষ্য হলো দেশের অভ্যন্তরে বেসরকারি বিনিয়োগের বাধা দূর করা, বড় মাত্রায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ ও শহরের মধ্যে শক্তিশালী যোগাযোগ অবকাঠামো তৈরি এবং সুষম আঞ্চলিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। এছাড়া বাংলাদেশের মধ্যমেয়াদি উন্নয়ন রূপরেখা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য আরও ২০ লাখ (২ মিলিয়ন) ডলারের কারিগরি সহায়তা দেবে সংস্থাটি, যা এডিবির আসন্ন ‘কান্ট্রি পার্টনারশিপ স্ট্র্যাটেজি’ বা দেশীয় অংশীদারত্ব কৌশলের সাথে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের পূর্ণাঙ্গ সমন্বয় ঘটাবে।
চলতি ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিশ্রুতি কর্মসূচির অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে গতকাল রবিবারই ঢাকায় এডিবির সাথে প্রায় ১৪০ কোটি (১.৪ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের এক গুচ্ছ ঋণ চুক্তি সই করেছে সরকার। বিশেষ বিষয় হলো, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), রাসায়নিক সার এবং বৈশ্বিক শিপিং বা জাহাজ ভাড়া মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশের ওপর যে তীব্র বহিস্থ চাপ তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় এডিবি তাদের এই চলমান তহবিল তাৎক্ষণিকভাবে আরও ২৫ কোটি ডলার বাড়িয়েছে।
দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংক খাতের চরম তারল্য সংকটের এই সময়ে এডিবির এই দ্রুত আর্থিক প্রতিক্রিয়া দেশের ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনীতিকে বড় ধরনের পতনের হাত থেকে রক্ষা করবে বলে মনে করছেন বিশ্লষকরা।
সফরকালে এডিবির প্রেসিডেন্ট মাসাতো কান্দা অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গেও এক বিশদ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন। সেখানে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংস্কার এজেন্ডা, সামষ্টিক অর্থনীতির তীব্র চাপ, বহিস্থ অর্থায়নের তাত্ক্ষণিক প্রয়োজনীয়তা এবং সরকারের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি অর্জনের কৌশলগুলো নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়। এর পাশাপাশি কান্দা দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী নেতাদের সাথে বৈঠক করে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রতিবন্ধকতাগুলো শোনেন। পুঁজিবাজারকে আরও গভীর ও স্বয়ংক্রিয় করা, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সহ-অর্থায়ন ও বেসরকারি পুঁজির জোগান বাড়াতে এডিবি সরকারের সাথে যৌথভাবে কাজ করছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।













