কোরবানির ঈদ ঘনিয়ে এলেই চামড়া খাতের জন্য কোটি কোটি টাকার ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু প্রতিবছরের মতো এবারও সেই লক্ষ্যমাত্রা কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কাঁচা চামড়া কেনার প্রধান এই মৌসুমে খেলাপি ঋণের দোহাই এবং ট্যানারি মালিকদের ঋণ পরিশোধে অনীহার কারণে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে চরম উদাসীনতা দেখাচ্ছে। ফলে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এই খাতটি বরাবরের মতোই পুঁজি সংকটে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গতকাল প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এই আশঙ্কাজনক চিত্র পাওয়া গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চামড়া খাতে ব্যাংকগুলোর অনীহা বছরের পর বছর ধরে ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকও প্রতিবছর লক্ষ্যমাত্রার আকার কমিয়ে আনতে বাধ্য হচ্ছে। চলতি বছরের কোরবানির ঈদ উপলক্ষে চামড়া খাতে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়েছে মাত্র ২২৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অথচ গত বছর এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬৪৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছিল মাত্র ৬৫ কোটি টাকা, যা মোট লক্ষ্যের মাত্র ১০ শতাংশ।
একইভাবে ২০২৪ সালে ৬১০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ১২৫ কোটি এবং ২০২৩ সালে ৪৪৩ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২৭০ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছিল। জ্যামিতিক হারে কমছে এই ঋণ বিতরণের হার।
চামড়া খাতে ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোর এই চরম অনীহার পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে বিশাল অঙ্কের খেলাপি ঋণ এবং ব্যবসায়ীদের একাংশের টাকা ফেরত না দেওয়ার মানসিকতা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ প্রসঙ্গে বলেন, চামড়া খাতে এবার ঋণ দেওয়ার লক্ষ্য ছিল ২২৮ কোটি টাকা। শেষ পর্যন্ত কী পরিমাণ ঋণ ছাড় হবে তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ ঋণের টাকা ফেরত দিতে চান না। এই দীর্ঘমেয়াদি সংস্কৃতির কারণেই এ খাতে ঋণখেলাপির পরিমাণ অনেক বেড়েছে এবং ব্যাংকগুলোও নতুন করে ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনোয়ারুল ইসলাম ব্যাংকের পক্ষ থেকে কিছু প্রক্রিয়াগত জটিলতার কথা তুলে ধরে জানান, ট্যানারি ব্যবসায়ীদের অনেকেই মাত্র ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে ঋণ নবায়ন বা রিসিডিউল করতে চান না। এছাড়া ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ ও প্রক্রিয়াগত কিছু নীতিমালার কারণেও চামড়া খাতের ঋণ বিতরণে লক্ষ্য পূরণ হয় না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চামড়া শিল্পখাতে বর্তমানে বিতরণকৃত ঋণের মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫ হাজার ২৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণই ১ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে এ খাতে খেলাপির হার ১২ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
ব্যবসায়ীদের কাঁচা চামড়া কেনার সুবিধার্থে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবছরই বিশেষ নীতি সহায়তা বা ছাড় দিয়ে থাকে। গত ৫ মে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, যেসব চামড়া ব্যবসায়ীর আগে পুনঃ তফসিল করা ঋণ আছে, তাদের ক্ষেত্রে নতুন ঋণ পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ কিস্তি বা ‘কম্প্রোমাইজড অ্যামাউন্ট’ জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত শিথিল করা হয়েছে। অর্থাৎ, খেলাপি বা পুরোনো ঋণ থাকা সত্ত্বেও ব্যবসায়ীরা চামড়া কেনার জন্য নতুন মূলধনি ঋণ পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এর আগে ২০২১ সালেও মাত্র ২ শতাংশ এককালীন পরিশোধের মাধ্যমে ১০ বছরের জন্য ঋণ নিয়মিত করার ঢালাও সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এত সুবিধার পরও মাঠপর্যায়ে ঋণ বিতরণের গতি বাড়েনি।
ট্যানারি মালিক ও চামড়া ব্যবসায়ীদের দাবি, ব্যাংকগুলো ঢালাওভাবে খেলাপির অভিযোগ তুলে ঋণ দিতে অনীহা দেখাচ্ছে। তাদের মতে, সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের তুলনায় চামড়া খাতের খেলাপি ঋণ এবং খেলাপির হার অনেক নিচে। বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ট্যানারিমালিক ও বাণিজ্যিক রপ্তানিকারক মিলিয়ে তাদের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৭০০।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবছর শুধু প্রজ্ঞাপন বা হুকুম দিয়েই দায়িত্ব শেষ করে। ব্যাংকগুলো ঋণ না দিলে বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করলে তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। অথচ দেশের অন্যান্য রুগ্ণ শিল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকার নীতি সহায়তা বা বেলআউট দেওয়া হচ্ছে।
চামড়া খাতের ঋণ বিতরণে আরেকটি বড় গলদ হলো—ব্যাংকগুলোর অর্থায়ন কেবল বড় বড় ট্যানারিমালিক ও নির্দিষ্ট কিছু রপ্তানিকারকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। প্রান্তিক পর্যায়ে যারা মূল চামড়া সংগ্রহ করেন, সেই আড়তদাররা ব্যাংকিং সুবিধা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত।
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস ব্যবসায়ী আজম মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ব্যাংকগুলো শুধু ট্যানারিমালিক ও বড় রপ্তানিকারকদের ঋণ দেয়। আমাদের মতো কাঁচা চামড়া ব্যবসার মূল চালিকাশক্তিদের কোনো ঋণ দেওয়া হয় না। আমরা যদি মৌসুমের শুরুতে চাহিদা অনুযায়ী টাকা পেতাম, তবে চামড়া নষ্ট হওয়ার হার অনেক কমে যেত।
চামড়ার আড়তদার বাবুল হোসেন জানান, এই শিল্পের প্রায় সিংহভাগ কাঁচা চামড়া সংগৃহীত হয় ঈদুল আজহার সময়। কিন্তু ব্যাংক থেকে সঠিক সময়ে পুঁজি না পাওয়া এবং সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রতিবছর দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ চামড়া পচে নষ্ট হয়। অথচ জাতীয় প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ তৈরির পাশাপাশি গত অর্থবছরেও এই চামড়া খাত থেকে প্রায় দেড় বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, চামড়া খাতের এই বিপুল সম্ভাবনাকে টিকিয়ে রাখতে হলে ব্যাংকগুলোর অনীহা দূর করার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের প্রকৃত ব্যবসায়ীদের হাতে ঋণ পৌঁছানো নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।












