দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ ও গুরুতর অশনিসংকেত তৈরি করছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর (এসওই) চরম লোকসান, প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা এবং সরকারের দেওয়া ক্রমবর্ধমান গ্যারান্টির বিশাল দায়। ২০১৮ থেকে ২০২২ অর্থবছরের মধ্যে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক কার্যকারিতা এবং লাভজনকতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে, যেখানে ইকুইটি বা মূলধনের ওপর রিটার্ন ৮৮ শতাংশ এবং মোট সম্পদের ওপর রিটার্ন প্রায় ৭৮ শতাংশ ধসে পড়েছে। এই বিপুল লোকসান ও দায়ভার আলটিমেটলি জাতীয় রাজস্বের ওপর বিশাল বোঝা হিসেবে চেপে বসছে, যা দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক সংস্কারকে গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ অ্যাট আ ক্রসরোডস অব রিফর্মস’ শীর্ষক সুশাসন ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের এই ভঙ্গুর ও বিপজ্জনক আর্থিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর দেশের সামগ্রিক কর কাঠামো, ঋণ ব্যবস্থাপনা, জনস্বার্থ এবং জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা যাচাই করে এই বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
এডিবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ অর্থবছর শেষে বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬১ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু এই বিশাল সম্পদের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের চরম অভাবের কারণে এগুলো সরকারের জন্য অন্যতম বড় আর্থিক মাথাব্যথা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে এসব রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার সামগ্রিক মুনাফা অর্জনের সক্ষমতায় যে ভয়াবহ ধস নেমেছে, তা দেশের আর্থিক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে।
বিপরীতে এসব অলাভজনক ও লোকসানি প্রতিষ্ঠানের মোট দায় এবং সরকারের দেওয়া সার্বভৌম গ্যারান্টির পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। অনেক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান তাদের বাণিজ্যিক বা পরিচালন ব্যয় মেটাতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিচ্ছে, যা পরবর্তীতে খেলাপি ঋণে পরিণত হচ্ছে। ব্যাংকগুলো যাতে এই অর্থ বরাদ্দ দেয়, তার জন্য সরকার নিজস্ব কোষাগারকে বাজি রেখে গ্যারান্টি প্রদান করছে, যা সামগ্রিক রাজস্ব খাতের ওপর মারাত্মক বহিস্থ আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করছে।
আর্থিক স্বচ্ছতার ক্ষেত্রে আরও একটি বড় ঘাটতি হলো, সরকারের সমন্বিত বাজেট ও হিসাব রক্ষণ ব্যবস্থা বা ‘আইবাস++’ এই সমস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের আর্থিক লেনদেন ট্র্যাক করতে পারে না। এই ডিজিটাল ব্যবস্থাটি বকেয়া ব্যয় বা দেনা মনিটর করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ এবং স্বশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ সংস্থাগুলোর বড় অংশের লেনদেন এর আওতাবহির্ভূত রয়ে গেছে। ট্রেজারি সিঙ্গেল অ্যাকাউন্টের (টিসিএ) বাইরে প্রায় ১৯ হাজার সরকারি ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যার ফলে সরকারের প্রকৃত নগদ অর্থের অবস্থান ও আর্থিক খাতের সুনির্দিষ্ট তারল্য নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হচ্ছে।
এই সমস্ত শাসনতান্ত্রিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় এডিবি একটি সমন্বিত জরুরি সংস্কারের রূপরেখা প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় মালিকানা নীতি ও কঠোর আর্থিক আইন প্রণয়ন করা অন্যতম, যাতে তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়। এডিবি মনে করে, ২০২৬ সালের নভেম্বরে এলডিসি বা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক সুযোগ-সুবিধা ও সহজ ঋণ কমে যাবে; তাই রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের এই বিশাল লোকসানের ছিদ্র অবিলম্বে বন্ধ করা না গেলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়ানো কঠিন হবে।












