বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের ভুল নীতি, রাজনৈতিক সদিচ্ছার চরম অভাব এবং আমলাতান্ত্রিক উদাসীনতায় দেশের এক সময়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত ‘চামড়া শিল্প’ এখন সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। এই ঐতিহ্যবাহী খাতের অস্তিত্ব সংকট কাটাতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে অবিলম্বে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন ‘লেদার বোর্ড’ গঠনের জোর দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
একই সাথে ক্ষতিগ্রস্ত ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের টিকিয়ে রাখতে ৫০০ কোটি টাকার বিশেষ আর্থিক বরাদ্দ, তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের মতো সমপরিমাণ রপ্তানি প্রণোদনা এবং সাভার চামড়া শিল্প নগরীতে জরুরি ভিত্তিতে নতুন দুটি সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) স্থাপনের দাবি উঠেছে।
শনিবার (২৩ মে) রাজধানীতে লেদার ডিভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ (এলআইডিএফবি) আয়োজিত ‘অস্তিত্ব সংকটে চামড়াশিল্প: উত্তরণের উপায় অনুসন্ধান’ শীর্ষক এক বিশেষ সেমিনারে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী, অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা এসব দাবি ও ঘুরে দাঁড়ানোর ১৩ দফা প্রস্তাবনা পেশ করেন।
সেমিনারে বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারে অপরিকল্পিত ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ট্যানারি স্থানান্তরের পর থেকেই এই খাতের পতন ত্বরান্বিত হয়েছে। যার ফলে বৈশ্বিক বাজারে এক সময় বাংলাদেশের যে চামড়া প্রতি বর্গফুট ২ ডলারে বিক্রি হতো, তা এখন আন্তর্জাতিক চক্রান্তের শিকার হয়ে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ সেন্টে নেমে ঠেকেছে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ ও নথিপত্র উপস্থাপন করে এলআইডিএফবি-এর সভাপতি সাদাত হোসেন সেলিম দেশের চামড়া খাতের প্রাতিষ্ঠানিক অভিভাবকহীনতার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “চামড়া খাতের উন্নয়ন তদারকিতে একক কোনো অভিভাবক নেই। দীর্ঘদিন ধরেই এ শিল্পের অগ্রগতিতে বিগত স্বৈরাচারী সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার তীব্র অভাব ছিল।”
সাভার চামড়া শিল্প নগরীর সিইটিপির তীব্র সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, “কাগজে-কলমে সাভারের সিইটিপির বর্জ্য শোধনের ক্ষমতা ২৫ হাজার কিউবিক মিটার বলা হলেও বাস্তবে তা মাত্র ১৪ হাজার কিউবিক মিটার। ফলে বুড়িগঙ্গা নদী বাঁচাতে গিয়ে আমরা এখন সাভারের ধলেশ্বরী ও তুরাগকে বিষাক্ত বর্জ্য দিয়ে মেরে ফেলছি। অথচ আমলারা যখন ছাগল পালন শিখতে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিদেশ যান, তখন এই খাতের টেকসই উন্নয়নে আমলাতন্ত্রের কোনো ভ্রুক্ষেপ বা চেষ্টা থাকে না।” তিনি সতর্ক করে বলেন, যথাযথ প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবে প্রতি বছর কোরবানির ঈদের প্রায় ৩০ শতাংশ কাঁচা চামড়া পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়।
সেমিনারে আমন্ত্রিত অতিথি ঢাকা-৫ আসনের সংসদ সদস্য কামাল হোসেন বিগত সরকারের সমালোচনা করে বলেন, “ফ্যাসিবাদী আমলের গভীর চক্রান্তের মাধ্যমে যেভাবে পাটশিল্পকে লোকসানি দেখিয়ে ধ্বংস করা হয়েছিল, ঠিক একইভাবে এবার জাতীয় চামড়াশিল্পকেও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।”
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল আমীন এ খাতে বিপুল কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী অপার সম্ভাবনা উল্লেখ করে কোরবানির চামড়া সুরক্ষায় দেশের বিভিন্ন স্থানে দ্রুততম সময়ে সরকারি উদ্যোগে ‘কোল্ড স্টোরেজ’ তৈরির দাবি জানান।
অন্যদিকে, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড ‘বেফাক’-এর মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক ওলামা মাঠপর্যায়ের এক আশঙ্কাজনক চিত্র তুলে ধরে বলেন, “দেশের মোট কোরবানির চামড়ার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মূলত এতিম ও গরিব ছাত্রদের কল্যাণে মাদ্রাসাগুলো সংগ্রহ করে থাকে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে বাজারে সিন্ডিকেটের কারণে চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় মাদ্রাসাগুলো চরম লোকসানের মুখে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামীতে তারা কাঁচা চামড়া সংগ্রহ পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে, যা এই শিল্পের জন্য চূড়ান্ত বিপর্যয় ডেকে আনবে।”
সেমিনারে অংশ নেওয়া ব্যবসায়ীরা সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, সাভারের সিইটিপি কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব না হওয়ায় আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স সংস্থা ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’ (এলডব্লিইজি)-এর সনদ বাংলাদেশ পাচ্ছে না। ফলে দেশের ট্যানারিগুলো ইউরোপ বা আমেরিকার মূল বাজারে সরাসরি চামড়া রপ্তানি করতে পারছে না। আর এই সনদের অভাবকে পুঁজি করে চীন সম্পূর্ণ নামমাত্র মূল্যে বাংলাদেশের বিশ্বমানের চামড়া কিনে নিচ্ছে এবং তা প্রক্রিয়াজাত করে অন্য দেশে পাচার করে বিপুল মুনাফা লুটছে। এই বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে অবিলম্বে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে সুনির্দিষ্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক ও কেমিক্যাল জোন প্রতিষ্ঠা এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘লেদার-ফুটওয়্যার বিশ্ববিদ্যালয়’ স্থাপনের জন্য বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।












