এক বছরে কৃষিখাতের খেলাপি ঋণ চারগুন বাড়লো

ডিএসজে

পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকিং খাত থেকে দেওয়া ব্যাপক হারের ‘বেনামি ঋণ’ ও জালিয়াতির চূড়ান্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত কৃষি খাতে। বছর ব্যবধানে খেলাপি ও শ্রেণিকৃত কৃষিঋণের পরিমাণ অবিশ্বাস্যভাবে প্রায় ২৯০ শতাংশ বা চার গুণ লাফিয়ে ২০ হাজার কোটি টাকা পার করেছে। একই সাথে আদায় অযোগ্য বকেয়া ও অতিরিক্ত বকেয়া (ওভারডিউ) ঋণের স্থিতি দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়ায় পুরো কৃষি অর্থায়ন ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও কার্যকারিতা এখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

শনিবার (২৩ মে) বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগের প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এই উদ্বেগজনক ও আশঙ্কাজনক চিত্র পাওয়া গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে যেখানে দেশের ব্যাংক খাতে মোট শ্রেণিকৃত বা খেলাপি কৃষিঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ৫ হাজার ১৬১ কোটি টাকা, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে তা একধাক্কায় ১৪ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ১১১ কোটি ৪৩ লাখ টাকায়। প্রবৃদ্ধির হিসাবে এই উল্লম্ফন রেকর্ড ২৮৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। সূত্র নিশ্চিত করেছে, বর্তমানে খেলাপি হওয়া এসব ঋণের সিংহভাগই বিগত ফ্যাসিবাদের সময়ে কৃষিঋণের নামে অসাধু উপায়ে বিতরণ করা হয়েছিল, যা এখন আর কোনোভাবেই আদায় হচ্ছে না।

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, খেলাপি ঋণের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর ওপর। এই খাতের শ্রেণিকৃত ঋণ ২ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা থেকে ৩৯৫ শতাংশের বেশি বেড়ে ১৩ হাজার ৪১৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ১ হাজার ৫৮৭ কোটি থেকে বেড়ে হয়েছে ৫ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। এছাড়া ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ২২২ শতাংশ বেড়ে ৮৮৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে কোনো খেলাপি ঋণ নেই।

খেলাপি ঋণের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর আদায়ের জন্য নির্ধারিত মোট বকেয়া (আউটস্ট্যান্ডিং) কৃষিঋণ ৩৮ হাজার ২২৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৫৫ হাজার ৩৯৯ কোটি ৮০ লাখ টাকায় ঠেকেছে। এক বছরের ব্যবধানে বকেয়া কৃষিঋণ বেড়েছে ৪৪ দশমিক ৯১ শতাংশ। একই সময়ে অতিরিক্ত বকেয়া বা ‘ওভারডিউ’ ঋণ ১২৫ শতাংশের বেশি লাফিয়ে ১০ হাজার ৯৬ কোটি টাকা থেকে একধাক্কায় ২২ হাজার ৭৩১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

আদায়ের ক্ষেত্রে চরম ধস ও ঝুঁকি তৈরি হলেও চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) মাঠপর্যায়ে কৃষিঋণ বিতরণে উল্লেখযোগ্য গতি বজায় ছিল। আলোচ্য সময়ে দেশের ব্যাংকগুলো কৃষি ও পল্লী খাতে মোট ৩০ হাজার ৫৯৯ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের (২৪ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা) তুলনায় ২৩.৮ শতাংশ বা ৫ হাজার ৭৩৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা বেশি।

চলতি অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত ৩৯ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে নয় মাসেই অর্জন দাঁড়িয়েছে ৭৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ। দেশের জিডিপিতে ১০ দশমিক ৯৪ শতাংশ অবদান রাখা এবং ৪৬ শতাংশ কর্মসংস্থানের উৎস এই খাতের ধারাবাহিকতা রক্ষায় বিতরণ বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ ব্যবস্থাপনা কঠোর করা না গেলে ব্যাংক খাতের চাপ আরও বাড়বে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

ব্যাংকভিত্তিক বিতরণ পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১২ হাজার ৮১১ কোটি ৯১ লাখ টাকা বিতরণ করে মোট বরাদ্দের ৪২ শতাংশ অংশীদারিত্ব নিয়ে শীর্ষে রয়েছে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি একাই ২ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা বিতরণ করেছে, যা একক ব্যাংক হিসেবে বেসরকারি খাতে সর্বোচ্চ। এছাড়া বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক তাদের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ৯৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ অর্জন করে সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা বিতরণ করেছে, যার বকেয়া স্থিতি এখন ২২ হাজার ৬৪ কোটি টাকা।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোনালী ব্যাংক ১ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক লক্ষ্যমাত্রার ১০৫ শতাংশ পূরণ করে ৭৯৪ কোটি টাকা বিতরণ করেছে। তবে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে সামগ্রিক ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোতে, যেখানে বিতরণ আগের বছরের চেয়ে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ কমে ৪,১০৮ কোটি টাকায় নেমেছে।

ব্যবহারিক খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মোট বিতরণের সিংহভাগ বা ১৪ হাজার ৮১৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা (৪৮.৪১ শতাংশ) গেছে ফসল খাতে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী ফসল খাতে ন্যূনতম ৫৫ শতাংশ ঋণ দেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। এছাড়া প্রাণিসম্পদ ও খামারিদের মাঝে ৮ হাজার৩৮ কোটি (২৬.২৭ শতাংশ), মৎস্য খাতে ৪ হাজার ২২৩ কোটি ৯৭ লাখ এবং পল্লীঋণে ৩ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মূল্যায়নে স্পষ্ট বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা কৃষকদের টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত করতে ঋণ বিতরণ বাড়াতে হবে, তবে একই সাথে অতীতের রাজনৈতিক লুটপাটের খেলাপি তকমা থেকে কৃষি খাতকে মুক্ত করতে কঠোর নজরদারি ও আদায় কার্যক্রম জোরদার করার কোনো বিকল্প নেই।

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top