বিগত বছরগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক অকার্যকারিতার সুযোগ নিয়ে অসাধু নিরীক্ষকদের মাধ্যমে প্রস্তুতকৃত ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন বা মিথ্যা হিসাব বিবরণীর ওপর ভিত্তি করেই দেশের ব্যাংক খাত থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা বের করে নেওয়া হয়েছে। একই সাথে মিথ্যা ও ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তৈরি করা হিসাবের মাধ্যমে দুর্বল ও মৌলিকত্বহীন কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়েছে, যার চূড়ান্ত খেসারত দিচ্ছে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি। এই মহাসংকট থেকে উত্তরণে এবং পুঁজিবাজার ও ব্যাংকিং খাতের প্রতি দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হিসাববিদদের ‘স্বপ্রণোদিত নিয়ন্ত্রণ’ বা সেলফ-রেগুলেশনের কোনো বিকল্প নেই।
বুধবার (২০ মে) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি), দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি) এবং দ্য ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত দেশের প্রথম ‘ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড রিপোর্টিং (এফএআর) সামিট-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এসব কথা বলেন। এবারের সামিটের মূল প্রতিপাদ্য ছিল “ট্রাস্টওয়ার্দি ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং: হোয়াট রিয়েলি ম্যাটার্স”।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি অস্থিতিশীল সময় পার করেছে। আমাদের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা, তদারকি ব্যবস্থা ও ওয়াচডগ বডিগুলো অলমোস্ট অকার্যকর হয়ে পড়েছিল, যার কারণে আর্থিক খাতে এক ধরনের চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। মিথ্যা রিপোর্টিং বা ফলস রিপ্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে দুর্বল কোম্পানিগুলো প্রিমিয়াম হাতিয়ে নিতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে, যার ফলে ভালো ও মৌলিক কোম্পানিগুলো বাজারে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে।”
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ২০১৫ সালে এফআরসি গঠিত হলেও ২০২৬ সাল পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়ে তারা কী ভূমিকা রেখেছে, তা সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্ট নয়।
কোনো রেগুলেটরি বডির পক্ষেই প্রতিদিন ডে-টু-ডে গিয়ে ভুলত্রুটি ধরা সম্ভব নয় উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, “আইসিএবি এবং আইসিএমএবি-কে কেবল বার্ষিক সাধারণ সভা বা ডিনারের আয়োজক হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। তাদের মেম্বাররা কীভাবে পারফর্ম করছে এবং সঠিক অডিট করছে কি না—তা কঠোরভাবে সেলফ-রেগুলেট করতে হবে।” স্বপ্রণোদিত নিয়ন্ত্রণের পক্ষে নিজের অতীত বাণিজ্যমন্ত্রীর আমলের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, পূর্বে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) বিরুদ্ধে ইউটিলাইজেশন (ইউডি) সনদ দেওয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ থাকায় তিনি তা বিজিএমইএ-এর হাতে তুলে দিয়েছিলেন, যা আজ পর্যন্ত সফলভাবে চলছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, “অতীতের গাফিলতিগুলো পুরো অর্থনীতিকে একধরনের বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আজ ব্যাংক খাতের যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি, তা আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। অতীতে দেখা গেছে নিরীক্ষা ফার্মগুলো নিজেরাই নিজেদের বিচারক হয়েছে এবং হিসাবরক্ষণ আইনের বাইরে থেকে গেছে।”
তিনি আরও বলেন, ভুয়া আর্থিক প্রতিবেদন দেখে হাজার হাজার মানুষ পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মুখে পড়েছেন। অসৎ প্রতিযোগীরা বেশি বেশি লাভ দেখিয়ে বিনিয়োগ খাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি করায় সৎ উদ্যোক্তারা ঋণ না পেয়ে ব্যাংকে ব্যাংকে ঘুরছেন, আর খেলাপিরা টাকা নিয়ে যাচ্ছেন।
সামিটে আমন্ত্রিত অতিথি বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান একটি চাঞ্চল্যকর উদাহরণ দিয়ে বলেন, সম্প্রতি একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানি কেনার চেষ্টা করার সময় আমি দেখলাম, তাদের সম্পদ ও দায়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল অসংগতি আছে। পুঁজিবাজার থেকে বেশি প্রিমিয়াম নেওয়ার জন্য তথ্য ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে হিসাব বিবরণী তৈরি করা হয়েছিল।
মাহমুদ হাসান খান বলেন, ৭ হাজার ২০০ প্রতিষ্ঠান বিজিএমইএর নিবন্ধন নিয়েছিলো, যার মধ্যে এখন মাত্র ২ হাজার ৫০০টি টিকে আছে, কারণ বাকিরা ঠিকভাবে হিসাব রাখেনি। ফুলিয়ে–ফাঁপিয়ে হিসাব তৈরি করলে প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যায় এবং বর্তমানে হিসাব পদ্ধতি স্বচ্ছ না থাকলে বিদেশী ক্রেতারা পণ্যও কিনতে চান না।”
অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এফআরসি চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া। মূল প্রবন্ধে দেশের আর্থিক রিপোর্টিংয়ের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে—কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব, স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগে যোগ্যতার বদলে পরিচিতি এবং ভয়ভীতি ও চাপের মুখে সিইও ও সিএফওদের স্বাধীনভাবে কাজ করতে না দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। এছাড়া দেশে প্রায় তিন লাখ প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন থাকলেও মাত্র ৩৫ হাজার প্রতিষ্ঠান ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করে বলে জানানো হয়।
সংকট উত্তরণে এফআরসির বিশেষজ্ঞ জনবল বৃদ্ধি, আইনের অধীন বিধিমালা চূড়ান্তকরণ, নৈতিক করপোরেট সংস্কৃতি গড়ে তোলা, ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং চালু, শরীয়াহভিত্তিক আর্থিক প্রতিবেদনের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ এবং খেলাপি ঋণের ঝুঁকি কমাতে সম্পদ ও দায়ের যথাযথ মূল্যায়নে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সামাপনী বক্তব্যে জানান, জেপি মরগ্যানসহ হংকং ও লন্ডনের বড় বড় ফান্ড ম্যানেজাররা বাংলাদেশে আসতে চায়; আমরা সেখানে ‘বাংলাদেশ ডেডিকেটেড ফান্ড’ ফ্লোট করার পরিকল্পনা করছি। তবে এই বিশাল বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের প্রথম ও প্রধান শর্তই হলো নির্ভরযোগ্য আর্থিক প্রতিবেদন।













