দেশের গ্রামীণ ও স্থানীয় শিল্পোৎপাদন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গ্রামীণ অর্থনীতিকে পরিবেশবান্ধব বা ‘সবুজ’ শিল্পে রূপান্তরের লক্ষ্যে ১০০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করা হয়েছে। সোমবার (১১ মে) বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্ট থেকে এই সংক্রান্ত একটি বিস্তারিত সার্কুলার জারি করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত ৫ হাজার কোটি টাকার শক্তিশালী ‘গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড’ (জিটিএফ) থেকেই এই ১০০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো স্থানীয় পর্যায়ের শিল্পোদ্যোক্তাদের টেকসই ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দিকে ধাবিত করা। বিশেষ করে যারা প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে চান, তাদের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ।
এই তহবিলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর স্বল্প সুদের হার। বর্তমান বাজার পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মাত্র ৫ শতাংশ সর্বোচ্চ সুদে শিল্পোদ্যোক্তারা এই ঋণ সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন। অন্যদিকে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করতে মাত্র ১ শতাংশ সুদে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। সুদের হারের এই ব্যাপক ব্যবধান মূলত গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগে আগ্রহী করে তুলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নতুন নীতিমালার পরিধি বেশ বিস্তৃত। পরিবেশবান্ধব যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানি ছাড়াও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সবুজ প্রযুক্তির সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রেও এই অর্থায়ন প্রযোজ্য হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, শিল্প ইউনিটের জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধি, পানি সংরক্ষণ ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনা, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পুনর্ব্যবহারযোগ্য কার্যক্রমের প্রসারে এই তহবিল থেকে প্রয়োজনীয় পুঁজি সংস্থান করা যাবে।
ঋণের মেয়াদের ক্ষেত্রেও উদ্যোক্তাদের সুবিধাজনক অবস্থানের কথা ভাবা হয়েছে। প্রকল্পের প্রকৃতি এবং স্থায়িত্ব বিবেচনা করে ঋণের মেয়াদ হবে ২ থেকে ৫ বছর। বিনিয়োগের শুরুর দিকে আর্থিক চাপ কমাতে সর্বোচ্চ ৬ মাস পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ড সুবিধা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রথম ছয় মাস উদ্যোক্তাকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না।
একজন একক ঋণগ্রহীতা এই তহবিলের আওতায় সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের আবেদন করতে পারবেন। প্রকল্পের মোট আমদানি বা ক্রয়মূল্যের সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো। তবে এই সুবিধার বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত জুড়ে দিয়েছে— সংশ্লিষ্ট শিল্প প্রকল্পে ব্যবহৃত মোট বিদ্যুতের অন্তত ১০ শতাংশ অবশ্যই নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা সৌরবিদ্যুৎ থেকে আসতে হবে।
ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সার্কুলারে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো ঋণখেলাপি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এই তহবিলের আওতায় বিন্দুমাত্র সুবিধা পাবে না। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত সব ব্যাংক এই ঋণ বিতরণের সুযোগ পেলেও বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের হার ২০ শতাংশের নিচে থাকার বাধ্যতামূলক শর্ত দেওয়া হয়েছে।
যেসব ব্যাংক ইতিপূর্বেই ‘গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ডের’ আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে অংশগ্রহণ চুক্তি সম্পন্ন করেছে, তাদের এই নতুন ঋণের জন্য পুনরায় কোনো চুক্তির প্রয়োজন হবে না। তারা সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গাইডলাইন অনুসরণ করে উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রদান শুরু করতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ কেবল পরিবেশ রক্ষায় নয়, বরং দেশের সামগ্রিক টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনেও মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই তহবিলের কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোর সক্ষমতা বহুগুণ বেড়ে যাবে, যা ভবিষ্যতে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
তৃণমূল পর্যায়ে আধুনিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশ দূষণ কমানোর এই বহুমুখী পরিকল্পনা মূলত একটি সবুজ ও সমৃদ্ধ স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার পথে বড় চালিকাশক্তি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আশা করছে, এর ফলে গ্রামীণ এলাকায় বড় ধরনের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রাও অর্জন সহজ হবে।













