আঞ্চলিক বাণিজ্য লেনদেনের দায় মেটাতে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) মার্চ-এপ্রিল প্রান্তিকের আমদানি বিল বাবদ ১৫১ কোটি ৪০ লাখ ডলার পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই বড় অংকের অর্থ পরিশোধের ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে আবারও বড় ধরনের টান পড়তে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বিল পরিশোধের এই তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরপর এই দায় শোধ করতে হয়।
সাধারণত প্রতি দুই মাস অন্তর আকুর সদস্য দেশগুলোর মধ্যকার আমদানি-রপ্তানি বিল সমন্বয় করা হয়। গত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি প্রান্তিকে আকু বিলের পরিমাণ ছিল ১৩৬ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। সেই তুলনায় মার্চ-এপ্রিল প্রান্তিকে আমদানির ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর আগের পরিসংখ্যানগুলো পর্যালোচনায় দেখা যায়, নভেম্বর-ডিসেম্বর সময়ে ১৫৩ কোটি ডলার এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবর সময়ে ১৬১ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়েছিল। ধারাবাহিকভাবে এই বিশাল অংকের দায় পরিশোধের ফলে রিজার্ভের ওপর ক্রমাগত চাপ বজায় থাকছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৬ মে দিন শেষে দেশের গ্রস বা মোট রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩৫ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার। তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) নির্ধারিত বিপিএম৬ পদ্ধতি অনুযায়ী, প্রকৃত রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩০ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। আকু বিলের এই ১৫১ কোটি ডলারের বেশি অর্থ বাদ দিলে বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভ ২৯ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে আসবে। এটি সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আকু বিল পরিশোধের পর তা চূড়ান্তভাবে সমন্বয় হতে এবং রিজার্ভের হিসাবে প্রতিফলিত হতে সাধারণত কয়েকদিন সময় লাগে। একারণে তাৎক্ষণিকভাবে রিজার্ভের প্রকৃত হ্রাসমান চিত্রটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ড্যাশবোর্ডে দেখা যায় না। তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই হালনাগাদ তথ্যে রিজার্ভের এই পতন স্পষ্টভাবে ফুটে উঠবে। ডলার সংকটের এই সময়ে রিজার্ভের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন নীতিনির্ধারকদের প্রধান চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি লেনদেন সাধারণত ব্যাংকিং চ্যানেলে তাৎক্ষণিকভাবে সম্পন্ন হলেও আকুর সদস্য দেশগুলোর ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন। এটি এশিয়ার কয়েকটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে একটি আন্তঃআঞ্চলিক লেনদেন নিষ্পত্তিব্যবস্থা। বর্তমানে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, ইরান, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, ভুটান ও মালদ্বীপ এই ব্যবস্থার সদস্য। এই দেশগুলোর মধ্যে সংঘটিত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পাওনা প্রতি দুই মাস অন্তর একত্রিত করে নেট পেমেন্ট হিসেবে শোধ করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মানে ধস নামায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। আকুর মতো বড় অংকের পেমেন্টগুলো এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসবহুল পণ্য আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করে ডলার সাশ্রয়ের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তবুও খাদ্য, জ্বালানি ও শিল্পের কাঁচামালের মতো মৌলিক আমদানির দায় মেটাতে গিয়ে রিজার্ভের ক্ষয় রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।













