আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) নজিরবিহীন থোক বরাদ্দের পথে হাঁটছে সরকার। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে রেকর্ড ৫৯ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বরাদ্দ জনসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিএনপির নতুন সরকারের ইতিবাচক অভিপ্রায়ের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষমতার অভাব সত্ত্বেও বাজেট ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর এই কৌশল অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আগামী অর্থবছরের ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপিতে স্থানীয় মুদ্রার জোগান ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। তবে এই বিশাল অঙ্কের মধ্যে বড় একটি অংশই কোনো সুনির্দিষ্ট প্রকল্পের অধীনে নেই। সাধারণত প্রতি অর্থবছরে থোক বরাদ্দ ১৫ হাজার কোটি টাকার আশেপাশে থাকলেও এবার তা ১ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এর বাইরে বিশেষ প্রয়োজনে সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা বাবদ আরও ১৭ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে, যা উন্নয়ন বাজেটের সামগ্রিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাতের চিত্রটি সবচেয়ে চমকপ্রদ। প্রকল্প বাস্তবায়নে অদক্ষতার কারণে এই খাতে নিয়মিত প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অথচ এই খাতের জন্য প্রকল্পের বাইরে থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হয়েছে ২৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এর মানে হলো, সরকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়নে বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচে প্রস্তুত, কেবল কারিগরি সক্ষমতা ও সঠিক প্রকল্পের অপেক্ষায় রয়েছে এই তহবিল। যদিও চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ হিমশিম খাচ্ছে।
একইভাবে শিক্ষা খাতেও প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত ১৭ হাজার ৪২৬ কোটি টাকার বিপরীতে থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩১ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির অভাব থাকলেও সরকার চায় শিক্ষার প্রসারে যেন অর্থের কোনো সংকট না থাকে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোতে ৫ থেকে ৭ গুণ বেশি থোক বরাদ্দ রাখা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
তবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে মোট ৫৯ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল থোক বরাদ্দ মূলত সরকারের জনকল্যাণমুখী মানসিকতারই প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও বিশ্লেষকরা পরিকল্পনা কমিশনের ‘উল্টো পথে’ হাঁটা নিয়ে শঙ্কিত, তবে সরকারের পক্ষ থেকে একে আগামীর উন্নত বাংলাদেশ গড়ার প্রাথমিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্বের বর্তমান অস্থির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের এই বিশাল থোক বরাদ্দ নির্ভর এডিপি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনার ফলে জ্বালানি তেলের বাজারে যে অস্থিরতা চলছে, তা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতিকে আগামীতে আরও উসকে দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই বাজেট ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর নীতি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে সংকটে ফেলতে পারে। পরিকল্পনা কমিশন যেখানে প্রকল্প যাচাই-বাছাইয়ে কঠোর হওয়ার কথা, সেখানে মন্ত্রণালয়ের চাহিদা ছাড়াই থোক বরাদ্দ বাড়িয়ে দেখানো হচ্ছে।
জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের অনুকূলে ২০ হাজার ৭৫১ কোটি টাকার বেশি থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় মুদ্রার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার অংশও রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্প প্রস্তাবনা ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা না বাড়িয়ে কেবল বাজেটের আকার বড় করার এই প্রয়াস চ্যালেঞ্জিং। তবে নতুন সরকারের যে ভিশন এবং স্বাস্থ্য-শিক্ষার মতো খাতে আমূল পরিবর্তনের যে অঙ্গীকার, তার প্রতিফলন এই বিশাল বরাদ্দ। মাঠপর্যায়ে এই অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে তা দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে নতুন প্রাণ দিতে পারে।













